বড় পদক্ষেপ! সরাসরি চাষিদের থেকে পেঁয়াজ কিনবে কেন্দ্র

পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক সংকটের জেরে রপ্তানি মার খানোয় দেশের বাজারে হু হু করে কমছে পেঁয়াজের দাম। এই পরিস্থিতিতে মহারাষ্ট্রের পেঁয়াজ চাষিদের চরম আর্থিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে এক বড়সড় ও জরুরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল কেন্দ্রীয় সরকার। চাষিদের লোকসান রুখতে এবং বাজার দর স্থিতিশীল করতে এখন থেকে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কুইন্টাল প্রতি ১২৩৫ টাকা (অর্থাৎ কেজি প্রতি ১২ টাকা ৩৫ পয়সা) দরে পেঁয়াজ কেনা শুরু করবে কেন্দ্র।
শুক্রবার মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলায় আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে খোদ কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান এই মেগা সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন। এই সময় মঞ্চে তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ।
রপ্তানি বন্ধ ও বাম্পার ফলনেই বিপর্যয়
ভারতের মোট পেঁয়াজ উৎপাদনের সিংহভাগ বা প্রায় ৩৫ শতাংশই আসে মহারাষ্ট্র থেকে। বিশেষ করে নাসিক, সোলাপুর, কোলাপুরের মতো জেলাগুলি পেঁয়াজ চাষের প্রধান কেন্দ্র। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, চলতি মরসুমে রাজ্যে যেমন পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে, ঠিক তেমনই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ বিমান হামলার পর তৈরি হওয়া সামগ্রিক পশ্চিম এশিয়া সংকটের জেরে বাংলাদেশ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে ভারতের পেঁয়াজ রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
রপ্তানি পুরোপুরি থমকে যাওয়ায় দেশের পাইকারি বাজারগুলিতে পেঁয়াজের জোগান উপচে পড়ে এবং দাম রেকর্ড স্তরে নেমে যায়। পরিস্থিতি এতটাই সঙ্গিন হয়ে ওঠে যে, অনেক মণ্ডিতে চাষিরা বাধ্য হয়ে মাত্র ৫০ পয়সা থেকে ১ টাকা কেজি দরে পেঁয়াজ বিক্রি করছিলেন। খরচ তুলতে না পেরে বহু কৃষক রাস্তায় ফসল ফেলে দিয়ে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছিলেন।
ন্যাফেড-কে সরাসরি ক্রয়ের নির্দেশ
চাষিদের এই চরম দুর্দশা কাটাতে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ সরাসরি কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রকের হস্তক্ষেপ দাবি করেছিলেন। তারই প্রেক্ষিতে এই দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হলো। কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান সাতারার মঞ্চ থেকে স্পষ্ট জানান:
- কেন্দ্রীয় নোডাল সংস্থা ‘ন্যাফেড’ (NAFED)-কে আজ থেকেই কুইন্টালে ১২৩৫ টাকা দরে পেঁয়াজ কেনা শুরু করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
- চাষিদের সুবিধার্থে তাঁদের উৎপাদিত সমস্ত পেঁয়াজের স্টকই সরকার কিনে নেবে।
- পেঁয়াজ ক্রয়ের এই পুরো প্রক্রিয়ায় যাতে কোনো রকম অনিয়ম বা কালোবাজারি (‘গड़बড়’) না হয়, তার জন্য কর্মকর্তাদের কড়া নজরদারি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সিদ্ধান্ত স্বাগত জানালেও ক্ষুব্ধ চাষি সংগঠনগুলি
কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তকে মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ কৃষকদের জন্য এক ‘বিশাল স্বস্তি’ বলে স্বাগত জানালেও, মহারাষ্ট্রের প্রধান প্রধান পেঁয়াজ চাষি সংগঠনগুলি কিন্তু এই দামে একেবারেই খুশি নয়। ‘মহারাষ্ট্র স্টেট অনিয়ন গ্রোয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর পক্ষ থেকে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে জানানো হয়েছে, বর্তমান সময়ে সার, বীজ, বিদ্যুৎ, শ্রমিক এবং পরিবহণ খরচ যেভাবে আকাশছোঁয়া হয়েছে, তাতে কুইন্টাল প্রতি ১২৩৫ টাকা দরে চাষিদের উৎপাদন খরচই উঠবে না।
চাষি সংগঠনগুলির দাবি, ২০১৩ সালে যখন দাম পড়েছিল, তখন তৎকালীন উপ-মুখ্যমন্ত্রী ফড়নবিশ নিজেই ২৪১০ টাকা কুইন্টাল দরে পেঁয়াজ কেনার ব্যবস্থা করেছিলেন। সেখানে ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে মূল্যবৃদ্ধির বাজারে এই দাম কৃষকদের ‘ঘায়ে নুনের ছিটে’ দেওয়ার শামিল। চাষিদের দাবি, অবিলম্বে এই দাম বাড়িয়ে কুইন্টাল প্রতি অন্তত ৩০০০ টাকা (কেজিতে ৩০ টাকা) করতে হবে, না হলে রাজ্যজুড়ে বড়সড় আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা। তবে ক্ষোভ-বিক্ষোভের আবহেই সরকারের এই হস্তক্ষেপে বাজারে ধস কিছুটা হলেও আটকানো যাবে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।