ভাতা বন্ধের সিদ্ধান্তে তোলপাড় বঙ্গ রাজনীতি, রাজ্য সরকারের পদক্ষেপকে সাহসী আখ্যা তসলিমার

পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠনের মাত্র নয় দিনের মাথায় এক ঐতিহাসিক ও নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিল নতুন রাজ্য মন্ত্রিসভা। আগামী মাস থেকে রাজ্যে ধর্মের ভিত্তিতে পরিচালিত সমস্ত ধরনের সহায়তামূলক প্রকল্প ও ধর্মীয় ভাতা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হতে চলেছে। এর ফলে ইমাম, মোয়াজ্জেম এবং পুরোহিতদের দেওয়া মাসিক ভাতাও আর মিলবে না। সরকারের এই কড়া পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে রাজ্যজুড়ে তীব্র চর্চা শুরু হয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে এক দীর্ঘ বার্তায় একে ‘জরুরি ও সঠিক পদক্ষেপ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন নির্বাসিত স্বনামধন্য সাহিত্যিক তসলিমা নাসরিন।
ধর্মীয় মেরুকরণ ও ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতিতে রাশ টানার চেষ্টা
সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে রাজ্যের নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল সরকারের এই সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। তিনি স্পষ্ট জানান যে, চলতি মে মাসে এই প্রকল্পের সুবিধা পাওয়া গেলেও আগামী জুন মাস থেকে তা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে। তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর এবং সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরে ধর্মীয় শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তিতে যেসব সহায়তামূলক প্রকল্প চলত, তা আর কার্যকর থাকছে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে দেওয়া সুশাসন ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতির পথেই হাঁটছে বর্তমান সরকার। এই সিদ্ধান্তের মূল কারণ হলো রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি বজায় রাখা এবং করদাতাদের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা, যা আগে ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতো বলে অভিযোগ ছিল।
ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধের পক্ষে সওয়াল
রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে সাহিত্যিক তসলিমা নাসরিন বলেন, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের কাজ কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে পোষা বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা করা নয়। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, দরিদ্র মানুষকে সাহায্য করা মানবিক কাজ হলেও তার ভিত্তি ধর্মীয় পরিচয় হওয়া উচিত নয়; বরং তা হওয়া উচিত নাগরিকের দারিদ্র্যের নিরিখে। তাঁর মতে, স্কুলের শিক্ষক, হাসপাতালের বেড কিংবা বিজ্ঞানচর্চার মতো মৌলিক ক্ষেত্রগুলো যখন অবহেলিত, তখন ধর্মীয় পদাধিকারীদের ভাতা দেওয়া কোনো উন্নত রাষ্ট্রচিন্তার লক্ষণ হতে পারে না। ধর্মকে রাষ্ট্রের সঙ্গে মেশালে সমাজ ধর্মান্ধতার দিকে ধাবিত হয়, তাই রাষ্ট্র ও ধর্মের এই পৃথকীকরণ অত্যন্ত জরুরি ছিল।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী প্রভাবের সম্ভাবনা
সরকারের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের ফলে রাজ্যের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এক বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে সরকারি কোষাগারের একটি বিশাল অঙ্কের অর্থ সাশ্রয় হবে, যা শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের মতো জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। তবে, দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই ধর্মীয় ভাতা হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় পদাধিকারীদের একাংশের মধ্যে সাময়িক ক্ষোভ বা অর্থনৈতিক সংকটের সৃষ্টি হতে পারে। এই বিষয়ে সরকার শীঘ্রই একটি বিস্তারিত নির্দেশিকা ও বিজ্ঞপ্তি জারি করতে চলেছে, যার দিকে এখন নজর রয়েছে সকলের।