গঙ্গার জলচুক্তি নবীকরণ ঘিরে জটিলতা, ঢাকা ও দিল্লির নতুন শর্তে সংশয়ের মেঘ!

গঙ্গার জলচুক্তি নবীকরণ ঘিরে জটিলতা, ঢাকা ও দিল্লির নতুন শর্তে সংশয়ের মেঘ!

১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তির মেয়াদ আগামী ৩১ ডিসেম্বর শেষ হতে চলেছে। এই চুক্তির পুনর্নবীকরণ নিয়ে বুধবার থেকে কলকাতায় শুরু হয়েছে ভারত ও বাংলাদেশের সেচ ও নদী বিশেষজ্ঞদের তিন দিনব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। বাংলাদেশের জয়েন্ট রিভার কমিশনের সদস্য মহম্মদ আনোয়ার কবিরের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল এই আলোচনায় অংশ নিতে ভারতে এসেছেন। প্রতিনিধিদলে দেশটির বিদেশ মন্ত্রকের শীর্ষ কর্মকর্তা ছাড়াও দিল্লিতে নিযুক্ত হাই কমিশনের কূটনীতিকরা রয়েছেন। ভারতীয় পক্ষে আলোচনার নেতৃত্বে রয়েছেন কেন্দ্রীয় জলসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের যুগ্ম সচিব এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সেচ দফতরের চিফ ইঞ্জিনিয়ার। বৈঠকের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের ফরাক্কায় গিয়ে গঙ্গা নদীর জল পরিমাপ করারও কথা রয়েছে। তবে দুই দেশের নতুন কিছু শর্ত ও বাস্তব পরিস্থিতির কারণে এবারের চুক্তি নবীকরণ প্রক্রিয়া বেশ জটিল হয়ে উঠেছে।

শর্তের সংঘাত ও জল প্রবাহের টানাপোড়েন

তিরিশ বছর আগের চুক্তিতে ফরাক্কা পয়েন্টে জলের প্রবাহ অনুযায়ী নির্দিষ্ট অনুপাতে দুই দেশের মধ্যে জল বণ্টনের নিয়ম ছিল। কিন্তু এবার বাংলাদেশ জল বাড়ানোর দাবি তুলে নতুন প্রস্তাব দিয়েছে। ঢাকার দাবি, নতুন চুক্তিতে শুধু ফরাক্কা পয়েন্টের জল বিবেচনা করলে চলবে না; বরং ফরাক্কার আগে ঝাড়খণ্ড, বিহার, উত্তর প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডে খালের মাধ্যমে যে জল ব্যবহার করা হয়, তা-ও হিসাবের মধ্যে আনতে হবে। অন্যদিকে ভারতের যুক্তি, গত তিন দশকে গঙ্গার অববাহিকায় জনবসতি বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং নদীর বহমানতা কমে যাওয়ার কারণে বাস্তব পরিস্থিতি বদলে গেছে। ফলে ফরাক্কা পয়েন্টের বর্তমান প্রবাহকে ভিত্তি করেই চুক্তি হওয়া উচিত। এই মতবিরোধের কারণে দুই দেশের ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে, এবারের জলচুক্তি নবীকরণ সহজ হবে না।

কলকাতা বন্দরের স্বার্থ ও রাজনৈতিক সমীকরণ

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনও এই চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখছে। রাজ্যে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার আশা করেছিল, দিল্লি ও কলকাতায় একই দলের শাসন থাকায় চুক্তিটি সহজে সম্পন্ন হবে। তবে কলকাতার সরকারি মহলের ইঙ্গিত, কলকাতা বন্দরের (শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বন্দর) ক্ষতি করে রাজ্য সরকার কোনো চুক্তিতে সায় দেবে না। কেন্দ্রীয় সরকারও তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই বন্দরের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফলে ঢাকার চাহিদা মেটাতে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্যের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেবে না এবং শুভেন্দু অধিকারীর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজ্যের উচিত বন্দর ও সেচ দফতরকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে জলের প্রকৃত চাহিদা পরিমাপ করা।

সীমান্তবর্তী প্রকল্প ঘিরে নতুন বিতর্ক

চুক্তি পুনর্নবীকরণ হলে বাড়তি জল পাওয়া যাবে—এই আশায় বাংলাদেশ সরকার রাজবাড়ী জেলার পাংসায় পদ্ম নদীর ওপর একটি বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই প্রকল্পে সবুজ সংকেত দেওয়ার পর সেখানে প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। তবে ভারতের পক্ষ থেকে এই প্রকল্প নিয়ে তীব্র আপত্তি রয়েছে। নয়াদিল্লির আশঙ্কা, সীমান্ত থেকে মাত্র ৩০-৩৫ কিলোমিটার দূরে এই বাঁধ নির্মিত হলে ভারতের নদীয়া ও মুর্শিদাবাদ জেলায় গঙ্গার ভাঙন মারাত্মকভাবে বেড়ে যাবে। চলমান তিন দিনের বৈঠকে এই ভূ-রাজনৈতিক ও পরিবেশগত ইস্যুটিও আলোচনার টেবিলে বড়সড় প্রভাব ফেলতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *