‘সিএএ-র বাইরে সবাই অনুপ্রবেশকারী, গ্রেফতার করে বিএসএফ-এর হাতে দেবে রাজ্য পুলিশ’, অবৈধদের তাড়াতে মেগা আইন কার্যকরের ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর

উত্তরবঙ্গের মাটি থেকে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও কাটমানিমুক্ত শাসনের জোড়া বার্তার পর, এবার রাজ্যের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও নাগরিকত্ব ইস্যুতে সবথেকে বড় এবং বিস্ফোরক ঘোষণাটি করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বুধবার উত্তরবঙ্গের প্রশাসনিক বৈঠক শেষে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ (CAA)-র আওতায় যাঁরা পড়েন না, তাঁরা প্রত্যেকেই এ রাজ্যে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’। আর আজ, অর্থাৎ বুধবার থেকেই এই সমস্ত অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে রাজ্য থেকে বিতাড়িত করার এক নজিরবিহীন আইনি প্রক্রিয়া কার্যকর করল নতুন বিজেপি সরকার।
মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণার পর সীমান্ত জেলাগুলি-সহ গোটা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক তীব্র আলোড়ন ও মেরুকরণের সৃষ্টি হয়েছে। ছাব্বিশের মসনদ বদলের পর অনুপ্রবেশ রুখতে নবান্নের এই চরম আগ্রাসী পদক্ষেপকে মেগা মাস্টারস্ট্রোক হিসেবেই দেখছে রাজনৈতিক মহল।
কেন্দ্রের সেই ‘চিঠি’ কার্যকর করল নতুন সরকার, তোপ মমতার নীতিকে
বিগত তৃণমূল সরকারের আমলে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নির্দেশিকাকে যেভাবে উপেক্ষা করা হয়েছিল, সেই প্রসঙ্গ টেনে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তীব্র নিশানা করেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি একটি প্রশাসনিক চিঠির উল্লেখ করে বলেন:
“অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে সরাসরি সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফ (BSF)-এর হাতে তুলে দেওয়ার জন্য গত বছরই কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে এই রাজ্যকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিঠি পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ভোটব্যাঙ্কের নোংরা রাজনীতির কারণে আগের সরকার সেই আইন ও নির্দেশিকাকে আলমারিতে বন্দি করে রেখেছিল, কাজে লাগায়নি। আমরা ক্ষমতায় এসেই আজ থেকে সেই আইন গোটা রাজ্যে কঠোরভাবে কার্যকর করলাম।”
রাজ্য পুলিশ ও বিএসএফ-এর যৌথ ‘অপারেশন ডেপুটেশন’
নতুন মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, অনুপ্রবেশকারীদের বিতাড়িত করার ক্ষেত্রে এবার থেকে রাজ্য পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর মধ্যে এক অভূতপূর্ব সমন্বয় তৈরি করা হবে। নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী:
- পুলিশি গ্রেফতারি: রাজ্যের যেকোনো প্রান্তে অবৈধভাবে বসবাসকারী বিদেশি নাগরিকদের প্রথমে রাজ্য পুলিশ সুনির্দিষ্ট ধারায় গ্রেফতার করবে।
- বিএসএফ-এর হাতে হস্তান্তর: গ্রেফতারের পর আইনি প্রক্রিয়া মেনে তাঁদের সরাসরি বিএসএফ কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
- দেশ থেকে বিতাড়ন: এরপর বিএসএফ সীমান্ত দিয়ে তাঁদের নিজেদের দেশে ফেরত বা পুশ-ব্যাক (Push-back)-এর ব্যবস্থা করবে।
সিএএ-ই শেষ কথা, সুর চড়ালেন মুখ্যমন্ত্রী
শুভেন্দু অধিকারী আরও একবার মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে যে সমস্ত শরণার্থীরা ভারতে এসেছেন এবং সিএএ-র নিয়মের মধ্যে পড়েন, তাঁদের ভয়ের কোনো কারণ নেই। কিন্তু এই আইনের পরিধির বাইরে থাকা কোনো অবৈধ অনুপ্রবেশকারীকে বাংলার মাটিতে আর বরদাস্ত করা হবে না।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একদিকে যখন কলকাতা পুরসভায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্পত্তিতে বুলডোজার নোটিশ জারি হচ্ছে এবং নদিয়ায় মহুয়া মৈত্রের বিরুদ্ধে এফআইআর হচ্ছে, ঠিক তখনই শুভেন্দুর এই ‘অনুপ্রবেশকারী হঠাও’ অভিযান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই ঘোষণার ফলে নবান্ন এবার সরাসরি দিল্লির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের লাইনে হেঁটে রাজ্যের পুলিশ প্রশাসনকে ব্যবহার করা শুরু করল। এখন দেখার, রাজ্য সরকারের এই নয়া ফরমানের পর সীমান্ত এলাকাগুলির আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয় এবং বিরোধী তৃণমূল কংগ্রেস এর জবাবে কী রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করে।