জমি দেওয়ার নামে লক্ষ লক্ষ টাকা প্রতারণা! তৃণমূল নেতার বাড়ির সামনে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আত্মহত্যার চেষ্টা মহিলার

জমি দেওয়ার নামে লক্ষ লক্ষ টাকা প্রতারণা! তৃণমূল নেতার বাড়ির সামনে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আত্মহত্যার চেষ্টা মহিলার

রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর এবার নদিয়া জেলাতেও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাক্তন পঞ্চায়েত প্রধান তথা নেতার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও জালিয়াতির মারাত্মক খতিয়ান সামনে আসতে শুরু করেছে। জমি পাইয়ে দেওয়ার নামে লক্ষ লক্ষ টাকা ও সোনার গয়না আত্মসাতের অভিযোগে বুধবার নদিয়ার শান্তিপুরে এক নজিরবিহীন ও শিউরে ওঠা ঘটনা ঘটল। টাকা ফেরত না পেয়ে নিরুপায় হয়ে অভিযুক্ত তৃণমূল নেতার বাড়ির সামনেই নিজের গায়ে কেরোসিন তেল ঢেলে আত্মহত্যার চেষ্টা করলেন এক গৃহবধূ।

ছাব্বিশের মসনদ বদলের পর যখন কলকাতা, সল্টলেক থেকে শুরু করে জেলায় জেলায় হকার উচ্ছেদ, তোলাবাজি ও সিন্ডিকেট রাজের বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কড়া ‘ক্র্যাকডাউন’ চলছে, ঠিক তখনই শান্তিপুরের এই ঘটনায় ব্যাপক শোরগোল পড়ে গিয়েছে জেলা রাজনীতিতে।

১০ বছর ধরে টাকা-সোনা আত্মসাৎ, উল্টে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে খবর, অভিযুক্ত নেতার নাম উৎপল বসাক, যিনি নদিয়া জেলার তৃণমূলের শান্তিপুর ২ নম্বর ব্লকের সভাপতি এবং ফুলিয়া টাউনশিপ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রাক্তন প্রধান। ওই এলাকারই এক বাসিন্দা ওই মহিলা দীর্ঘদিন ধরে সপরিবারে বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকেন। তাঁর স্বামী কলকাতায় একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করেন এবং তাঁদের আট বছরের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে।

নিজের কোনো মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকায়, ওই মহিলা সরকারি জমি পাওয়ার আশায় তাঁর জীবনের সমস্ত জমানো পুঁজি ও সোনার অলঙ্কার উৎপল বসাকের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। মহিলার অভিযোগ:

  • প্রতারণার জাল: বিগত ১০ বছর ধরে দফায় দফায় লক্ষ লক্ষ টাকা এবং সোনা নিলেও তাঁকে কোনো জমি দেওয়া হয়নি।
  • উল্টে হুমকি: সম্প্রতি রাজ্যে সরকার বদল হতেই ওই মহিলা যখন বুঝতে পারেন যে তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন, তখন টাকা ফেরত চাইতে গেলে উৎপল বসাক ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা উল্টে তাঁদের সপরিবারে দেখে নেওয়ার হুমকি দিতে শুরু করেন।

নেতার বাড়ির সামনেই গায়ে কেরোসিন, উদ্ধার করল জনতা

বুধবার দুপুরে চরম হতাশা ও মানসিক অবসাদ থেকে বাঁচতে ওই মহিলা শান্তিপুরে উৎপল বসাকের বাড়ির সামনে গিয়ে সশরীরে নিজের গায়ে কেরোসিন তেল ঢেলে আগুন লাগানোর চেষ্টা করেন। তবে আশেপাশের মানুষজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা বিষয়টি দেখতে পেয়ে তড়িঘড়ি ছুটে আসেন এবং কোনো রকমে তাঁকে উদ্ধার করে এক বড়সড় বিপর্যয় এড়ান। খবর পেয়ে শান্তিপুর থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি সামাল দেয়।

ঘটনার পর কান্নায় ভেঙে পড়ে ওই মহিলা জানান, “আমাদের কোনো বাড়ি নেই বলে একটু জমি করে দেওয়ার নাম করে ওই তৃণমূল নেতা আমাদের সর্বস্ব লুটে নিয়েছে। আমি প্রশাসনের কাছে এর বিচার চাই।” ইতিমধ্যেই তিনি শান্তিপুর থানায় উৎপল বসাকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রতারণার লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

সবই বিজেপির ষড়যন্ত্র ও নাটক: সাফাই তৃণমূল নেতার

নিজের বিরুদ্ধে ওঠা এই মারাত্মক কাটমানি ও প্রতারণার অভিযোগ অবশ্য সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন তৃণমূল নেতা উৎপল বসাক। তিনি পাল্ট দাবি করেন:

“ওই মহিলার তোলা সমস্ত অভিযোগ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। রাজ্যে যেহেতু এখন সরকার বদল হয়েছে, তাই এলাকার কয়েকজন বিজেপি নেতা চক্রান্ত করে আমাকে ফাঁসানোর জন্য এই আত্মহত্যার নাটক করাচ্ছে। আমি কারও কাছ থেকে একটা টাকাও নিইনি। এই মিথ্যা অপবাদের বিরুদ্ধে আমি নিজেও ওই মহিলার বিরুদ্ধে থানায় পাল্টা লিখিত অভিযোগ জানাচ্ছি।”

কঠোরতম শাস্তির দাবি বিজেপির, পাশে থাকার আশ্বাস

খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে ছোটেন স্থানীয় বিজেপির পঞ্চায়েত সদস্য ডোনা বসাক। তৃণমূলকে তীব্র আক্রমণ করে তিনি বলেন, “মহিলার এই চরম পরিণতির কথা শুনেই আমি ছুটে আসি। মানুষের পাশে দাঁড়ানোই আমাদের প্রধান কাজ। আমরা জানতে পেরেছি, এই উৎপল বসাক শুধু এই মহিলাই নয়, এর আগেও এলাকার একাধিক দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে সরকারি সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। আমরা পরিবারটিকে থানায় অভিযোগ জানাতে বলেছি এবং নতুন প্রশাসনের কাছে দাবি জানাচ্ছি, এই দুর্নীতিবাজ তৃণমূল নেতাকে যেন অবিলম্বে গ্রেফতার করে কঠোরতম শাস্তি দেওয়া হয়।”

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একদিকে যখন পুর নিয়োগ দুর্নীতিতে দেবরাজ চক্রবর্তীর সিবিআই হেফাজত, সল্টলেকে তৃণমূল কাউন্সিলর রঞ্জন পোদ্দারের তোলাবাজির দায়ে হাজতবাস এবং ফলতার ময়দান ছেড়ে অভিষেক-ঘনিষ্ঠ জাহাঙ্গির খানের পলায়নে ঘাসফুল শিবির কোণঠাসা, ঠিক তখনই নদিয়ার এই ঘটনা প্রমাণ করে দিল যে, বিগত জমানার নেতাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে এবার আমজনতা নিজেই রাস্তায় নেমে হিসাব চাইতে শুরু করেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *