পশ্চিমবঙ্গে ওবিসি সংরক্ষণে ঐতিহাসিক মোড়, ১৭ থেকে কমে দাঁড়াল ৭ শতাংশে

পশ্চিমবঙ্গে ওবিসি সংরক্ষণে ঐতিহাসিক মোড়, ১৭ থেকে কমে দাঁড়াল ৭ শতাংশে

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী এবং বড়সড় পরিবর্তন এলো ওবিসি সংরক্ষণের নিয়মে। রাজ্যের নবগঠিত শুভেন্দু অধিকারীর সরকার ওবিসি সংরক্ষণ ১৭ শতাংশ থেকে এক ধাক্কায় কমিয়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। একই সঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য বরাদ্দ ওবিসি কোটা প্রায় সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা হয়েছে। নতুন সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর নেওয়া এই সিদ্ধান্তের ফলে রাজ্যে দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে চলা ওবিসি সংরক্ষণের চেনা সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে গেল।

প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক সমীকরণ

পশ্চিমবঙ্গে ২০১০ সাল পর্যন্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক অনগ্রসরতার ভিত্তিতে একটি সুনির্দিষ্ট নীতি মেনে ওবিসি সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু ছিল, যেখানে ৬৬টি জাতি অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে ২০১০ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার ওবিসি তালিকায় ৪২টি নতুন জাত যুক্ত করে সংরক্ষণকে ‘ক’ ও ‘খ’ এই দুই ভাগে বিভক্ত করে। পরবর্তীতে ২০১২ সালে ক্ষমতায় এসে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার আরও ৩৫টি জাত এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। এর ফলে ওবিসি তালিকায় মোট ৭৭টি নতুন উপ-জাতি যুক্ত হয়, যার মধ্যে ৭৫টিই ছিল মুসলিম সম্প্রদায়ের। ফলস্বরূপ, রাজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যা এই সংরক্ষণের আওতায় চলে আসে এবং মোট ওবিসি সংরক্ষণ দাঁড়ায় ১৭ শতাংশে।

হাইকোর্টের রায় ও সরকারি পদক্ষেপ

এই দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থার বড় পরিবর্তন ঘটে ২০২৪ সালের ২২ মে, যখন কলকাতা হাইকোর্ট এক যুগান্তকারী রায়ে ২০১০ সালের পর যুক্ত হওয়া ৭৭টি জাতির ওবিসি শংসাপত্রকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করে বাতিল করে দেয়। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, এই সংরক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে একমাত্র মাপকাঠি ছিল ধর্ম এবং এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তড়িঘড়ি করা হয়েছিল। হাইকোর্টের এই রায়কে কার্যকর করতেই বর্তমান শুভেন্দু সরকার সুপ্রিম কোর্টে থাকা পূর্ববর্তী সরকারের আপিল আবেদনটি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। পাশাপাশি, অনগ্রসর শ্রেণী কল্যাণ বিভাগের পক্ষ থেকে বিজ্ঞপ্তি জারি করে ২০১০ সালের পূর্ববর্তী মূল ৬৬টি জাতির তালিকা পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।

প্রভাব ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

সরকারের এই নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ওবিসি-এ এবং ওবিসি-বি-এর মতো ধর্ম-ভিত্তিক বিভাগগুলি সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হলো। নতুন তালিকায় ৭৪টি উপ-জাতি বাদ পড়েছে, যাদের অধিকাংশই মুসলিম সম্প্রদায়ের। বর্তমানে মাত্র তিনটি মুসলিম সম্প্রদায় (পাহাড়িয়া, হাজ্জাম ও চৌদালি) ওবিসি তালিকায় স্থান পেয়েছে। তবে কাপালি, কুর্মি, নাই, তান্তি, গোয়ালা, কর্মকার ও স্বর্ণকারের মতো বেশ কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী ও সামাজিক সম্প্রদায়কে এই তালিকায় বহাল রাখা হয়েছে।

এই সিদ্ধান্তের ফলে রাজ্যে এক বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোড়ন তৈরি হয়েছে। বর্তমান শাসক দলের দাবি, পূর্ববর্তী সরকারগুলি ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির জন্য অসাংবিধানিক উপায়ে মুসলিমদের ওবিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিল, যার কারণে প্রকৃত অনগ্রসর হিন্দু সম্প্রদায়গুলি দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। অন্যদিকে, বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে একে “মুসলিম-বিরোধী” এবং “সামাজিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থী” বলে আখ্যা দিয়েছে। তবে রাজনৈতিক তরজা বজায় থাকলেও, আইনি পথ মেনে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত রাজ্যের প্রশাসনিক ও শিক্ষা ক্ষেত্রে এক দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে চলেছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *