রেকর্ড গরমে জ্বলছে দেশ, বিদ্যুতের চাহিদা তুঙ্গে পৌঁছে কি বাড়বে লোডশেডিং?

রেকর্ড গরমে জ্বলছে দেশ, বিদ্যুতের চাহিদা তুঙ্গে পৌঁছে কি বাড়বে লোডশেডিং?

দেশজুড়ে চলছে তীব্র তাপপ্রবাহ। বিশেষ করে উত্তর, পশ্চিম এবং মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আবহাওয়ার পারদ প্রতিদিন নতুন রেকর্ড গড়ছে। দিল্লি ও ফরিদাবাদের মতো একাধিক এলাকায় তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে কোথাও কোথাও ৪৮ ডিগ্রিতে পৌঁছেছে। সকাল থেকেই চড়া রোদ আর অসহ্য গরমের কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত। এই তীব্র দাবদাহের সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের বিদ্যুৎ খাতের ওপর। গরম থেকে বাঁচতে দিন-রাত একটানা এয়ার কন্ডিশনার (এসি), কুলার এবং ফ্যানের ব্যবহার বাড়ায় বিদ্যুতের চাহিদা এখন আকাশছোঁয়া।

চাহিদার নয়া রেকর্ড ও বিগত বছরের তুলনা

চলতি সপ্তাহে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা নজিরবিহীন উচ্চতা ছুঁয়েছে। বুধবার বিদ্যুৎ চাহিদা একলাফে ২৬৫ গিগাওয়াট (GW) অতিক্রম করেছে, যা তার আগের দিন অর্থাৎ মঙ্গলবার ছিল ২৬০.৪৫ গিগাওয়াট। বিগত বছরগুলোর তুলনায় এই বৃদ্ধিকে একটি বড় লাফ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০২৪ সালের মে মাসে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রায় ২৫০ গিগাওয়াট। এরপর ২০২৫ সালে আবহাওয়া কিছুটা অনুকূল থাকায় এবং আগেভাগে বর্ষা আসায় চাহিদা ছিল ২৪২–২৪৩ গিগাওয়াটের কাছাকাছি। কিন্তু ২০২৬ সালের শুরু থেকেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে চাহিদা ২৫২, ২৫৬, ২৬০ পেরিয়ে এখন ২৬৫ গিগাওয়াট পার করেছে। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় এবার বিদ্যুৎ চাহিদা বেড়েছে ২০ গিগাওয়াটেরও বেশি।

অস্বাভাবিক চাহিদা বৃদ্ধির মূল কারণ

বিদ্যুতের এই আকস্মিক চাহিদা বৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো দিন ও রাতের তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। শুধু দিনেই নয়, রাতের তাপমাত্রাও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি থাকায় শহর ও শহরতলির মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে সারারাত একটানা এসি চালানোর প্রবণতা ব্যাপক বেড়েছে। বিশেষ করে দিল্লি ও তৎসংলগ্ন এলাকায় এই চাপ সবচেয়ে বেশি। বুধবার দুপুর ৩টে ৩৫ মিনিটে দিল্লিতে বিদ্যুতের চাহিদা সর্বকালের সর্বোচ্চ ৮,০৩৯ মেগাওয়াটে পৌঁছায়।

এর পাশাপাশি বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং দেশের জ্বালানি নীতিও এই বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে গণপরিবহন এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের (EV) ওপর জোর দিচ্ছে। তবে বৈদ্যুতিক স্কুটার, কার ও বাণিজ্যিক গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে চার্জিংয়ের প্রয়োজনে বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।

গ্রিডের সক্ষমতা ও সংকটের পূর্বাভাস

রেকর্ড চাহিদা সত্ত্বেও ভারতের জাতীয় গ্রিড এখন পর্যন্ত বড় কোনো বিপর্যয় ছাড়াই পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছে। ২০২২ সালের তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের তুলনায় বর্তমানে দেশের কয়লা মজুত যথেষ্ট শক্তিশালী, যা ভারতের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৭০ শতাংশেরও বেশি জোগান দেয়। এছাড়া, দিনের বেলার সর্বোচ্চ চাহিদা মেটাতে সৌরশক্তি বড় ভূমিকা রাখছে। তবে ব্যাটারি স্টোরেজ বা বিদ্যুৎ ধরে রাখার পরিকাঠামো সীমিত থাকায় সূর্যাস্তের পর সন্ধ্যার সময় গ্রিডের ওপর চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। আবহাওয়া দফতর উত্তর ভারতের বেশ কিছু এলাকায় হলুদ সতর্কতা জারি করে জানিয়েছে যে গরম আরও বাড়বে। যদি তাপপ্রবাহ এভাবে চলতে থাকে, তবে আগামীদিনে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যার ফলে লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, দেশে আপাতত বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *