‘আইন কার্যকরই ছিল না!’ পশুজবাই নির্দেশিকা ঘিরে আদালতে কী বললেন বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য?

‘আইন কার্যকরই ছিল না!’ পশুজবাই নির্দেশিকা ঘিরে আদালতে কী বললেন বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য?

বকরি ইদের মুখে গবাদি পশু জবাই নির্দেশিকা নিয়ে চরম আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে কলকাতা হাইকোর্টে। রাজ্যে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৯৫০ সালের প্রাণিসম্পদ সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রশাসনের লিখিত অনুমতি এবং ১৪ বছরের ঊর্ধ্বের বা স্থায়ীভাবে অক্ষম পশুর শংসাপত্র ছাড়া গবাদি পশু জবাই করা যাবে না। রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে একাধিক জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে, যার শুনানিতে বৃহস্পতিবার উঠে এসেছে বিবিধ আইনি, সামাজিক ও পরিকাঠামো সংক্রান্ত জটিল প্রশ্ন।

বয়স ও পরিকাঠামো নিয়ে বাস্তবসম্মত প্রশ্ন

শুনানি চলাকালীন মামলাকারীদের পক্ষে বর্ষীয়ান আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য এবং অন্যান্য আইনজীবীরা রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আদালতে প্রশ্ন তোলা হয়, একটি গরুর গড় আয়ু যেখানে প্রায় ১৫ বছর, সেখানে হঠাৎ করে ১৪ বছরের ঊর্ধ্বের গরু খুঁজে পাওয়া কীভাবে সম্ভব? এছাড়া, ১৯৫০ সালের এই আইনটি মূলত কৃষিকাজের স্বার্থে গবাদি পশু সংরক্ষণের জন্য আনা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান যুগে প্রযুক্তির উন্নতির ফলে কৃষিকাজ আর গরুর ওপর নির্ভরশীল নয়। তাছাড়া জৈবিক পরীক্ষা ছাড়া একটি পশুর বয়স নির্ধারণ করাও আসাম্ভব।

আদালতে আরও জানানো হয় যে, রাজ্যে ‘ফিটনেস শংসাপত্র’ দেওয়ার মতো কোনও উপযুক্ত সরকারি পরিকাঠামোই নেই। সাধারণ মানুষ শংসাপত্রের জন্য কোথায় যাবেন, পশু চিকিৎসক কারা— তা নিয়ে চরম অস্পষ্টতা রয়েছে। আগামী ২৮ মে বকরি ইদ, অথচ গত ১৩ মে তড়িঘড়ি এই বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী শংসাপত্র না পেলে ১৫ দিনের মধ্যে আপিল করার অধিকার রয়েছে, কিন্তু বিজ্ঞপ্তি ও ইদের মধ্যবর্তী সময় মাত্র ১৫ দিন হওয়ায় সাধারণ মানুষের সেই আইনি অধিকারও খর্ব হয়েছে। এর ফলে ইদের আগে সাধারণ নাগরিক ও এই পেশার সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষের চরম ভোগান্তির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ ও পাল্টা দাবি

মামলাকারীদের একাংশ এই বিজ্ঞপ্তির পাশাপাশি ১৯৫০ সালের মূল আইনটির সাংবিধানিক বৈধতাকেই আদালতে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তাঁদের দাবি, ১৯৫২ সালে এই আইনটি যখন বলবৎ হয়, তখন এটি শুধুমাত্র তৎকালীন পুর এলাকাগুলির জন্য কার্যকর ছিল; গ্রামীণ এলাকায় এটি কখনই প্রথাগতভাবে বিজ্ঞাপিত হয়নি। মানবিকতার খাতিরে অন্তত এবার ইদের জন্য আইনটি শিথিল করার আবেদন জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুর দাবি তুলে অন্য এক মামলাকারী রাজ্যে গরুসহ সব ধরনের পশু জবাইয়ের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার দাবি জানিয়েছেন।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও পরবর্তী প্রভাব

রাজ্য সরকার আদালতে স্পষ্ট করেছে যে, আইন অনুযায়ী ১৪ বছরের বেশি বয়সী বা সম্পূর্ণ অক্ষম গবাদি পশুই কেবল জবাইয়ের যোগ্য এবং এর জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা রাজ্য প্রাণিসম্পদ দফতরের লিখিত অনুমতি বাধ্যতামূলক। আইনটি দীর্ঘদিন কার্যকর ছিল না— মামলাকারীদের এমন যুক্তি খারিজ করে হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ দেয় যে, আইনটি সমাজে কার্যকর ছিল বলেই তা নিয়ে এতগুলি মামলা দায়ের হয়েছে এবং প্রতি বছরই এই সংক্রান্ত সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি করা হতো। এই আইনি টানাপোড়েনের জেরে উৎসবের মুখে গবাদি পশু ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব মাংসের বাজার এবং ধর্মীয় আচার উভয়ের ওপরেই পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *