কলকাতা পুরসভায় নজিরবিহীন নাটক! বন্ধ অধিবেশন কক্ষ, বারান্দার ক্লাব রুমেই মাইক ছাড়া ‘হাউস’ বসালেন ফিরহাদরা

কলকাতা পুরসভার (KMC) অন্দরে চলা নজিরবিহীন ছবি-বিতর্ক, বরো চেয়ারম্যান ও পুর-সচিবের বদলি সংক্রান্ত প্রশাসনিক সংকটের জল এবার গড়াল এক চূড়ান্ত ও অবিশ্বাস্য সংঘাতের দিকে। শুক্রবার কলকাতা পুরসভার মাসিক অধিবেশন বন্ধের নোটিশ জারি করেন পুর-সচিব। শুধু তাই নয়, বন্ধ করে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয় পুরসভার মূল অধিবেশন কক্ষের দরজায়। এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং পুরসভার ইতিহাসে ‘চরম সাংবিধানিক সংকট’ তৈরির বিরুদ্ধে সরব হয়ে শুক্রবার হাউসের বাইরে কাউন্সিলার্স ক্লাব রুমেই মাইক ছাড়াই সমান্তরাল ‘হাউস’ বসালেন তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) পুরপ্রতিনিধিরা।
রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর যখন উত্তর ২৪ পরগনার ভাটপাড়া ও হালিশহরের মতো পুরসভাগুলিতে তৃণমূলের গণ-ইস্তফা চলছে এবং বিধানসভার লবিতে বিরোধী দলনেতার ঘরের তালা খোলার দাবিতে আন্দোলন চলছে, ঠিক তখনই কলকাতা পুরসভার ভেতরে খোদ মেয়রের উপস্থিতিতে এই সমান্তরাল অধিবেশন বসার ঘটনা ছাব্বিশের বুকে এক নজিরবিহীন আইনি ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের রূপ নিল।
চেয়ারম্যানের নির্দেশ উপেক্ষা, দরজায় ঝুলল তালা
পুরসভা সূত্রে জানা গেছে, এদিন পূর্বনির্ধারিত সূচি মেনেই কলকাতা পুরসভার মাসিক অধিবেশন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বৃহস্পতিবারের চরম ডামাডোলের পর শুক্রবার আচমকাই পুরসভার সচিবের পক্ষ থেকে অধিবেশন স্থগিত বা বন্ধ রাখার একটি জরুরি নোটিশ জারি করা হয়। এই নোটিশ জারি হতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন তৃণমূলের কাউন্সিলররা।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে পুরসভার চেয়ারম্যান মালা রায় নিজে উদ্যোগী হয়ে অধিবেশন কক্ষের তালা খোলার নির্দেশ দেন। কিন্তু অভিযোগ, চেয়ারম্যানের স্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও পুর-প্রশাসনের একাংশ ও নিরাপত্তা কর্মীরা সেই তালা খুলতে অস্বীকার করেন। মূলত রাজ্যের নতুন সরকারের পরিকাঠামোগত রদবদল এবং কমিশনার ও মেয়রের টানাপোড়েনের জেরেই এই তালা খোলার নির্দেশ অমান্য করা হয়েছে বলে দাবি রাজনৈতিক মহলের।
মাইক ছাড়াই চলল অধিবেশন, উপস্থিত মেয়র ও পারিষদেরা
অধিবেশন কক্ষ তালাবন্ধ থাকায় দমে না গিয়ে এক অভিনব ও নজিরবিহীন প্রতিবাদের রাস্তা বেছে নেয় তৃণমূল কংগ্রেস। পুরসভার ভেতর ‘গণতন্ত্র ও স্বাধিকার রক্ষা’ করার বার্তা দিয়ে কাউন্সিলার্স ক্লাব রুমের ভেতরেই অস্থায়ী এজেন্ডা তৈরি করে বসে পড়েন পুরপ্রতিনিধিরা।
এই সমান্তরাল অধিবেশনের মূল চিত্র:
- শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি: ক্লাব রুমের এই অধিবেশনে স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন মেয়র ফিরহাদ (ববি) হাকিম, ডেপুটি মেয়র এবং সমস্ত মেয়র পারিষদেরা (MMIC)।
- মাইক ছাড়া সওয়াল: সরকারি কোনো পরিকাঠামো বা সাউন্ড সিস্টেম না পাওয়ায়, কোনো রকম মাইক ছাড়াই খালি গলায় চেঁচিয়েই এদিন কাউন্সিলররা নিজেদের বক্তব্য পেশ করেন এবং পুরসভার কাজকর্ম সচল রাখার পক্ষে সওয়াল করেন।
‘চরম সাংবিধানিক সংকট’, তোপ তৃণমূলের
এই নজিরবিহীন পদক্ষেপ প্রসঙ্গে তৃণমূলের পুরপ্রতিনিধিদের দাবি, নির্বাচিত পুর-বোর্ডকে অকেজো করে দিতে এবং কলকাতার নাগরিক পরিষেবা স্তব্ধ করতে এক শ্রেণির আমলা ও নতুন সরকারের মদতপুষ্ট আধিকারিকেরা সুপরিকল্পিতভাবে এই চক্রান্ত করছেন। স্বায়ত্তশাসিত একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে অধিবেশন কক্ষে তালা ঝোলানো ‘চরম সাংবিধানিক সংকট’ ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই প্রতীকী হলেও এই হাউস বসিয়ে তাঁরা বুঝিয়ে দিলেন যে পুরসভার রাশ এখনও নির্বাচিত মেয়রের হাতেই রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে যখন সিউড়িতে স্কুলের পোশাকে কাটমানি নিয়ে জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের হস্তক্ষেপে বিডিও তদন্ত শুরু করেছেন, অন্যদিকে বাদুড়িয়ার প্রাক্তন বিধায়ক কাজী আব্দুর রহিম খোদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে তোপ দাগছেন— সেই কঠিন সময়ে কলকাতার এই ‘ক্লাব রুম হাউস’ আসলে তৃণমূলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক মরিয়া রাজনৈতিক লড়াই। একদিকে প্রশাসনের কড়া নিয়ম আর অন্যদিকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এই জেদ আগামী দিনে কলকাতা পুরসভার ভবিষ্যৎকে কোন আইনি লড়াইয়ের দিকে ঠেলে দেয়, এখন সেটাই দেখার।