নিজে হেঁটে শ্মশানে যাওয়া ‘মৃত’ কাউন্সিলরসহ রাজ্যজুড়ে গ্রেফতার একঝাঁক তৃণমূল নেতা! ধরপাকড়ে কাঁপছে জেলা

রাজ্যে ক্ষমতার পটপরিবর্তন এবং শুভেন্দু অধিকারী সরকারের জমানায় তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে চলা ধস ও গণ-ইস্তফার মাঝেই এবার শুরু হলো পুলিশের মেগা ধরপাকড়। তোলাবাজি, কাটমানি, জমি দখল, অস্ত্র রাখা এবং ভোট-পরবর্তী হিংসার মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগে গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তর থেকে দক্ষিণবঙ্গ— রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে একঝাঁক হেভিওয়েট তৃণমূল নেতা ও কর্মীকে।
ব্যারাকপুর ও ভাটপাড়ায় তৃণমূলের গণ-ইস্তফা এবং বারাসাতে জনরোষের পর, পুলিশের এই অল-আউট অ্যাকশন ছাব্বিশের বুকে ঘাসফুল শিবিরের জেলা সংগঠনকে কার্যত পঙ্গু করে দিয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
খসড়া তালিকায় ‘মৃত’, শ্মশানে যাওয়া সেই সূর্য দে গ্রেফতার!
গ্রেফতারির তালিকায় সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনাটি ঘটেছে হুগলিতে। ডানকুনি পুরসভার ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর সূর্য দে-কে পুরনো একটি মারধরের মামলায় গ্রেফতার করেছে পুলিশ। কিছুদিন আগে এসআইআর (SIR) চলাকালীন সরকারি খসড়া তালিকায় সূর্য দে-কে ‘মৃত’ বলে দেখানো হয়েছিল। যার প্রতিবাদে তিনি নিজে হেঁটে শ্মশানে গিয়ে অভিনব বিক্ষোভ দেখিয়ে খবরের শিরোনামে এসেছিলেন।
পুলিশ জানিয়েছে, ২০২৫ সালের মে মাসে ডানকুনির বাসিন্দা সৌমিক পাঁজাকে বেধড়ক মারধর ও অত্যাচারের অভিযোগে সূর্য দে এবং তাঁর আরও ৩ জন ঘনিষ্ঠ তৃণমূল নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
সল্টলেকে তোলাবাজি, বুনিয়াদপুরে প্রাক্তন পুরপ্রধান শ্রীঘরে
সল্টলেকের বরো চেয়ারম্যান রঞ্জন পোদ্দারের গ্রেফতারির রেশ কাটতে না কাটতেই বিধাননগর পুরনিগমের এক মেয়র পারিষদের দুই ঘনিষ্ঠ তৃণমূল কর্মী সৌমিক দাস ও বিজয় রাজবংশীকে সিটি সেন্টার এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে দীর্ঘদিন ধরে মোটা অঙ্কের টাকা তোলার অভিযোগ রয়েছে এদের বিরুদ্ধে।
অন্যদিকে, দক্ষিণ দিনাজপুরেও বড় ধাক্কা খেয়েছে তৃণমূল। বুনিয়াদপুর পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান তথা প্রাক্তন মন্ত্রী বিপ্লব মিত্রের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত কমল সরকারকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। জমি বিক্রির জন্য তোলা চাওয়ার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। পাশাপাশি হিলি অঞ্চলের তৃণমূল নেতা কৌশিক মাহাতো এবং তাঁর দুই সহযোগী দিবাকর দাস ও মাসদুর রহমানও পুলিশের জালে ধরা পড়েছেন।
আবাসের কাটমানি থেকে অস্ত্র উদ্ধার: জেলাগুলির হালহকিকত
পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর এই যৌথ অভিযানে রাজ্যের অন্যান্য জেলা থেকেও তৃণমূলের প্রথম সারির একাধিক নেতা গ্রেফতার হয়েছেন:
- উত্তর ২৪ পরগনা (হিঙ্গলগঞ্জ): প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার সরকারি টাকায় কাটমানি ও কমিশন নেওয়ার অভিযোগে রূপোমারি গ্রাম পঞ্চায়তের উপপ্রধান তপন মণ্ডলকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
- কোচবিহার: এক মহিলাকে শ্লীলতাহানি ও হেনস্থার গুরুতর অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন স্থানীয় তৃণমূল কাউন্সিলর উজ্জ্বল তর।
- পূর্ব বর্ধমান (কেতুগ্রাম): গোপন সূত্রে খবর পেয়ে তল্লাশি চালিয়ে তৃণমূল নেতা মহম্মদ জাহাঙ্গির এবং তাঁর দুই সঙ্গীকে আস্ত পিস্তল, ম্যাগাজিন ও তাজা গুলিসহ গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
- পশ্চিম মেদিনীপুর (ডেবরা ও সবং): ভোট-পরবর্তী হিংসা ও বিজেপি কর্মীদের ওপর হামলার মামলায় ডেবরা ব্লক তৃণমূল সভাপতি প্রদীপ কর এবং সবং পঞ্চায়েত সমিতির পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ তরুণ মিশ্রকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
- দক্ষিণ ২৪ পরগনা (ক্যানিং): ক্যানিংয়ে এক বিজেপি কর্মীকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর অভিযোগে তৃণমূল যুব সভাপতি অরিত্র বসুর গ্রেফতারিকে কেন্দ্র করে গোটা এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়েছে।
এছাড়াও সন্দেশখালি, অশোকনগর, বনগাঁ ও হাবড়াতেও পুরোনো জামানায় সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার ও সিন্ডিকেট রাজ চালানোর অভিযোগে আরও একাধিক তৃণমূল নেতাকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে বাদুড়িয়ার প্রাক্তন বিধায়ক কাজী আব্দুর রহিম খোদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের তোলাবাজি নিয়ে মুখ খুলছেন, অন্যদিকে মণ্টু সাহার মতো পুরোনো চিল্ড্রেনরা পার্টি অফিস খালি করার নোটিস দিচ্ছেন— সেই চরম ডামাডোলের মাঝে এই গণ-গ্রেফতারি প্রমাণ করছে যে তৃণমূলের জন্য ছাব্বিশের পথ ক্রমশ অন্ধকার হয়ে উঠছে। নতুন সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির মুখে পড়ে আগামী দিনে এই গ্রেফতারির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আভাস মিলেছে পুলিশ সূত্রে।