পালাবদল হতেই ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’! সব জেলাশাসককে ‘হোল্ডিং সেন্টার’ গড়ার নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদল সম্পন্ন হতেই এবার বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে বড়সড় ও নজিরবিহীন পদক্ষেপের পথে হাঁটল নতুন বিজেপি সরকার। পশ্চিমবঙ্গে ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’ বা আটক শিবির তৈরির তৎপরতা শুরু হয়েছে জোরকদমে। বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করার পর তাদের নিজেদের দেশে ফেরত পাঠানোর (ডিপোর্টেশন) আগের চূড়ান্ত পর্ব হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যেই এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও পরিকাঠামো গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়ে রাজ্যের সমস্ত জেলাশাসকদের কাছে নবান্ন থেকে জরুরি চিঠি পাঠানো হয়েছে।
নাম ‘হোল্ডিং সেন্টার’, রাখা হবে মেয়াদ্উত্তীর্ণ বিদেশিদেরও
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, জেলাশাসকদের কাছে পাঠানো চিঠিতে বিতর্কিত ‘ডিটেনশন’ শব্দটি সরাসরি ব্যবহার করা হয়নি। তার বদলে ব্যবহার করা হয়েছে ‘ডিপোর্টেশন’ এবং জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা অস্থায়ী আটক কেন্দ্র তৈরি করার। রাজ্যে বিভিন্ন সীমান্ত বা এলাকা থেকে যে সমস্ত বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী ধরা পড়বে, তাদের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত রাখা হবে এই নির্দিষ্ট সেন্টারে। একই সঙ্গে, অনুপ্রবেশের দায়ে যে সমস্ত ‘বিদেশি’ নাগরিকদের জেলের মেয়াদের সময়সীমা শেষ হয়ে গিয়েছে, তাদেরও মুক্ত আকাশ বা সাধারণ সংশোধনাগারে না রেখে এই হোল্ডিং সেন্টারেই রাখার স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই নির্দেশিকায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের জারি করা বিগত বছরের ২ মে তারিখের একটি বিজ্ঞপ্তির গাইডলাইনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বদল রাজনৈতিক অবস্থানের, ফিরছে ‘ডিটেক্ট-ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’
অনুপ্রবেশকারীদের আটকে রাখা এবং পুশব্যাকের বিষয়টি নিয়ে আসামে এনআরসি (NRC) প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকেই দেশজুড়ে চরম বিতর্ক চলছে। পশ্চিমবঙ্গের পূর্বতন তৃণমূল সরকারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিকবার প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন যে, তাঁর রাজ্যে কোনো অবস্থাতেই ডিটেনশন সেন্টার তৈরি করতে দেওয়া হবে না। কিন্তু রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটতেই এই অবস্থান আমূল বদলে গেল। লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারের সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বারবার বাংলায় অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে বিতাড়িত করার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই প্রসঙ্গে একাধিকবার ‘ডিটেক্ট-ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ (চিহ্নিতকরণ, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ ও বহিষ্কার) নীতি কার্যকর করার বার্তা দিয়েছিলেন। বর্তমান সরকারের এই পদক্ষেপ তারই প্রথম প্রশাসনিক বাস্তবায়ন বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল।
শরণার্থী ও অনুপ্রবেশকারীর ফারাক স্পষ্ট করল শাসকদল
নতুন সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য স্পষ্ট করা হয়েছে যে, সিএএ (CAA) বা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু সহ ৬টি ‘অ-মুসলিম’ সম্প্রদায়ের মানুষদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে গণ্য করা হবে না। তাঁরা ‘শরণার্থী’ হিসেবে ভারতে বৈধ নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার সুযোগ পাবেন। এই কড়াকড়ি শুধুমাত্র বেআইনি মুসলিম অনুপ্রবেশকারী ও রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে।
এদিকে, এই নতুন নির্দেশিকাকে কেন্দ্র করে এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ায় ‘অ্যাডজুডিকেশন’ তালিকায় ঝুলে থাকা রাজ্যের প্রায় ২৭ লক্ষ ভোটারের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। যদিও প্রশাসনিক সূত্রে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, যেহেতু এই ভোটারদের আবেদন বা ভাগ্য এই মুহূর্তে বিচারাধীন, তাই চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের আটকে রেখে এই ডিপোর্টেশন সেন্টারে পাঠানো হবে না। তবে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর, পুলিশ আর কোনো অনুপ্রবেশকারীকে আদালতে না পাঠিয়ে সরাসরি বিএসএফের (BSF) মাধ্যমে সীমান্ত পার করে দেবে বলেই নবান্ন সূত্রে খবর।