‘১৫০ আসনে জোর করে হারানো হয়েছে, না হলে তৃণমূল ২২০-২৩০ পেত!’ বিস্ফোরক মমতা

‘১৫০ আসনে জোর করে হারানো হয়েছে, না হলে তৃণমূল ২২০-২৩০ পেত!’ বিস্ফোরক মমতা

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: গত ৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকে দীর্ঘ ২০ দিন প্রায় ‘মুখ বুজে’ই ছিলেন তিনি। কিন্তু রবিবার ফলতা উপনির্বাচনে দলের নজিরবিহীন ভরাডুবি এবং সেখানে বিজেপির জয়ের পরই আর নীরবতা বজায় রাখলেন না তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফল ঘোষণার ঠিক ২০ দিনের মাথায় এক ফেসবুক ভিডিও বার্তায় দলের পরাজয়ের কারণ পর্যালোচনা করতে গিয়ে সরাসরি নতুন বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে ভোট লুট ও মেগা কারচুপির বিস্ফোরক অভিযোগ আনলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর সাফ দাবি, নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীকে কাজে লাগিয়ে প্রায় ১৫০টি আসনে তৃণমূলকে জোর করে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে।

‘বিজেপি ভোট লুট না করলে তৃণমূল ২২০-২৩০ আসন পেত’

৪ মে-র ফলাফলে দেখা গিয়েছিল রাজ্য বিধানসভার ২৯৪টি আসনের মধ্যে বিজেপি ২০৭টি আসন পেয়ে ক্ষমতায় এসেছে এবং তৃণমূল থমকে গিয়েছে মাত্র ৮০টি আসনে। রবিবার ফলতার জয়ে বিজেপির আসন সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০৮। এই আবহেই ফেসবুক লাইভে এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, “বিজেপি যেভাবে ভোট লুট করেছে, তা না হলে মানুষের প্রকৃত জনমতে তৃণমূল ২২০ থেকে ২৩০টি আসন পেয়ে চতুর্থবারের জন্য রাজ্যে সরকার গঠন করত। বিজেপি এই নির্বাচনকে সম্পূর্ণ প্রহসনে পরিণত করেছে।”

ইভিএম রিগিং ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর পোশাকে লুটের অভিযোগ

নির্বাচন প্রক্রিয়া ও গণনার দিন কী ঘটেছিল, তা নিয়ে মারাত্মক সব অভিযোগ তুলেছেন তৃণমূল নেত্রী। ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, “নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীকে নগ্নভাবে ব্যবহার করেছে বিজেপি। এমনকি গণনার দিন কেন্দ্রীয় বাহিনীর পোশাক পরিয়ে নিজেদের লোক ঢুকিয়ে ভোট লুট করা হয়েছে। ১৫০টি বিধানসভা আসনে সম্পূর্ণ পাশা উলটে দেওয়া হয়েছে। ইভিএমে রিগিং করা হয়েছে এবং তথ্য হ্যাক (Data Hacking) করা হয়েছে। আমাদের জেতা আসনগুলি ওরা জোর-জবরদস্তি করে ছিনিয়ে নিয়েছে।”

‘রাজ্যে চলছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও বুলডোজার সংস্কৃতি’

নির্বাচনের পর গত ২০ দিনে রাজ্যে বিজেপি সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করেন মমতা। বর্তমান জমানাকে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’ বলে তোপ দেগে তিনি অভিযোগ করেন, “রাজ্যজুড়ে মানুষকে মারধর, খুন, ভাঙচুর ও ঘরবাড়ি দখল চলছে। মনীষী ও সমাজ সংস্কারকদের মূর্তি ভাঙা হচ্ছে। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে আমার তৈরি মূর্তি পর্যন্ত ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে! আমার ওপর রাগ থাকতে পারে, কিন্তু মূর্তির ওপর কেন?”

এখানেই শেষ নয়, কলকাতায় চলমান হকার উচ্ছেদ ও বেআইনি নির্মাণ ভাঙার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “বুলডোজার দিয়ে গরিবের বাড়ি-দোকান ভেঙে ফেলা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই তৃণমূলের ২৫০০টি পার্টি অফিস বিজেপি দখল করেছে। আমাদের কাউন্সিলরদের ধরে ধরে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এবং মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে। পুলিশকে কাজে লাগিয়ে রক্ষককে আজ ভক্ষক বানানো হয়েছে।”

প্রশাসনকে হুঁশিয়ারি এবং ২০২৯-এর লক্ষ্য

রাজ্যের বর্তমান প্রশাসনিক কর্তাদের আইন মেনে কাজ করার কড়া বার্তা দিয়েছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “আমি প্রশাসনের বিরোধী নই। কিন্তু আপনারা আইনের রক্ষক হয়ে আইন ভঙ্গ করলে, আপনারাও আইনের আওতায় পড়বেন। আমিও দেখতে চাই সংবিধান বড় নাকি বন্দুকের নল বড়।” পাশাপাশি, বিজেপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র টাকা রাজ্যবাসী প্রতি মাসে ঠিকমতো পাচ্ছেন কি না, তা কড়া নজরে রাখার জন্য সাধারণ মানুষের কাছে আবেদন জানিয়েছেন তিনি।

ভবিষ্যৎ রাজনীতির রূপরেখা টেনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট করে দেন যে, তৃণমূলের এখন প্রধান লক্ষ্য হলো জাতীয় স্তরে ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) জোটকে আরও শক্তিশালী করা এবং ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে কেন্দ্র থেকে বিজেপিকে হটানো। দেশের প্রধানমন্ত্রীকে আন্তর্জাতিক সফর নিয়ে খোঁচা দিয়ে তিনি বলেন, “জ্বালানি বাঁচানোর কথা বলে প্রধানমন্ত্রী নিজেই সারাক্ষণ বিদেশে ঘুরছেন। উনি চকোলেট ইতালির প্রধানমন্ত্রীকে না দিয়ে দেশের বাচ্চাদের দিতে পারতেন। দিল্লি চলে গেলে এরাজ্যের বিজেপি সরকার এমনিতেই টলমল হয়ে যাবে, আমরা এখন সেই দিনের জন্যই অপেক্ষা করছি।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *