ভোটের ভরাডুবির পর এবার বেসুরো শান্তনু, নিশানা করলেন উত্তরবঙ্গ লবিকে

পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবি এবং ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিপুল জনমত নিয়ে ক্ষমতা দখলের পর রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। এই পালাবদলের আবহেই তৃণমূল কংগ্রেসের চিকিৎসক নেতা তথা প্রাক্তন সাংসদ ডা. শান্তনু সেনের একের পর এক ইঙ্গিতবাহী সমাজমাধ্যম পোস্ট ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র জল্পনা তৈরি হয়েছে। নতুন বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশংসা করার পাশাপাশি নিজের দলেরই চিকিৎসক নেতাদের একাংশ ও স্বাস্থ্য প্রশাসনের শীর্ষ কর্তাদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ এনেছেন তিনি।
স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে দুর্নীতির বিস্ফোরক অভিযোগ
ডা. শান্তনু সেন সমাজমাধ্যমের পোস্টে আরজি কর মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন প্রিন্সিপাল সন্দীপ ঘোষ এবং তৃণমূলের চিকিৎসক নেতা ডা. সুদীপ্ত রায়ের যৌথ নেতৃত্বে হওয়া ভূরি ভূরি দুর্নীতির খতিয়ান তুলে ধরেছেন। তাঁর অভিযোগ, আরজি করের রোগী কল্যাণ সমিতির চেয়ারম্যান থাকাকালীন তিনি এই দুর্নীতির বিষয়গুলো কর্তৃপক্ষের নজরে আনার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তৎকালীন দুর্নীতিগ্রস্ত চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে উল্টে তাঁকেই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তথাকথিত ‘উত্তরবঙ্গ লবি’র কঠোর সমালোচনা করে তিনি জানান, পশ্চিমবঙ্গ মেডিকেল কাউন্সিল, স্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং হেলথ রিক্রুটমেন্ট বোর্ডে দুর্নীতির ঘুঘুর বাসা তৈরি হয়েছিল। এই লবির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তাঁকে এবং আরজি করের পড়ুয়া তাঁর মেয়েকে চরম মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।
শুভেন্দু সরকারের প্রশংসা ও ভবিষ্যৎ ইঙ্গিত
নতুন সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর স্বাস্থ্য নীতিকে দরাজ সার্টিফিকেট দিয়েছেন শান্তনু সেন। রাজ্যে ‘আয়ুষ্মান ভারত’ যোজনা চালু করা, চার জেলায় নতুন মেডিকেল কলেজ স্থাপন, জনঔষধি কেন্দ্রের সম্প্রসারণ এবং শূন্যপদ পূরণের মতো উদ্যোগকে একজন চিকিৎসক হিসেবে তিনি সাধুবাদ জানিয়েছেন। একই সঙ্গে আরজি কর কাণ্ডে জড়িত উত্তরবঙ্গ লবির সদস্যদের বিরুদ্ধে নতুন সরকারের কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাসকেও তিনি স্বাগত জানান। এই দলবিরোধী অবস্থানের পরও নিজেকে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে দাবি করে তিনি জানিয়েছেন, কোনো অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করে তিনি চিকিৎসকের পেশা এবং রাজনীতির নেশা—দুই-ই বজায় রাখবেন।
রাজনৈতিক প্রভাব ও পরিবর্তনের হাওয়া
তৃণমূলের অন্দরে দীর্ঘদিন ধরে কোণঠাসা থাকা শান্তনু সেনের এই প্রকাশ্য ক্ষোভ প্রকাশ শাসক শিবিরের অভ্যন্তরীণ ফাটলকে স্পষ্ট করে তুলেছে। নির্বাচনের পর ক্ষমতা হারানোর ধাক্কার মধ্যেই দলের প্রথম সারির একজন নেতার এই ‘বেসুরো’ অবস্থান তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শান্তনু সেনের এই অবস্থান কেবল ব্যক্তিগত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং রাজ্যের নতুন রাজনৈতিক পরিকাঠামোয় নিজের অবস্থান সুরক্ষিত করার এবং স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেট রাজের অবসানের একটি বড় ইঙ্গিত।