গর্ভের শিশুর সুরক্ষায় বিজ্ঞানীদের চমক, বারবার হাসপাতালে যাওয়ার দিন কি এবার শেষ!

গর্ভের শিশুর সুরক্ষায় বিজ্ঞানীদের চমক, বারবার হাসপাতালে যাওয়ার দিন কি এবার শেষ!

গর্ভাবস্থায় সন্তানের হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক কি না কিংবা তার নড়াচড়া ঠিক আছে কি না, তা নিয়ে হবু মায়েদের উদ্বেগের শেষ থাকে না। সাধারণত নির্দিষ্ট সময় অন্তর ক্লিনিকে গিয়ে আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসকেরা শিশুর স্বাস্থ্যের খোঁজ নেন। তবে দুটি পরীক্ষার মধ্যবর্তী দীর্ঘ সময়ে গর্ভের ভিতরে কী ঘটছে, তা জানার কোনো উপায় থাকে না। এই জটিল সমস্যার সমাধানেই বিজ্ঞানীরা এবার তৈরি করেছেন একটি বিশেষ ‘ওয়্যারেবল আলট্রাসাউন্ড প্যাচ’, যা ঘরে বসেই দীর্ঘক্ষণ ধরে গর্ভের শিশুকে পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম।

বিজ্ঞানীদের তৈরি এই পরিধানযোগ্য বিশেষ ডিভাইসটির নাম ‘UPatch’। এই প্রযুক্তি গর্ভাবস্থার আচমকা তৈরি হওয়া জটিলতাগুলো দ্রুত চিহ্নিত করতে এবং মৃত সন্তান প্রসবের ঝুঁকি কমাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। সম্প্রতি চিকিৎসাবিজ্ঞান সংক্রান্ত বিশ্বখ্যাত জার্নাল ‘Nature Biotechnology’-তে এই গবেষণার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

রিয়েল টাইমে নজরদারির নতুন প্রযুক্তি

প্রচলিত আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষাগুলো মূলত একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তের চিত্র তুলে ধরে। কিন্তু নতুন এই ‘UPatch’ গর্ভের শিশুর হৃদস্পন্দন, নড়াচড়া এবং নাড়ির মধ্য দিয়ে রক্তপ্রবাহের মতো বিষয়গুলো দীর্ঘ সময় ধরে রিয়েল টাইমে ট্র্যাক করতে পারে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেং জু জানান, বর্তমান প্রযুক্তি গর্ভের শিশুর অবস্থার কেবল মুহূর্তের ছবি তুলে ধরলেও এই প্যাচ দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম। এর ফলে প্রতিটি রোগীর শারীরিক পরিবর্তনের আলাদা প্যাটার্ন বা ধরন বোঝা চিকিৎসকদের জন্য অনেক সহজ হবে।

চিকিৎসকদের মতে, প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া, শিশুর বৃদ্ধি কমে যাওয়া বা রক্তপ্রবাহে বিঘ্ন ঘটার মতো গর্ভাবস্থার অনেক জটিলতাই হঠাৎ করে তৈরি হয় না, বরং ধীরে ধীরে শরীরে পরিবর্তন আসে। নিয়মিত ও একটানা নজরদারি না থাকলে অনেক সময় এই সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো এড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই নতুন ডিভাইসটি ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটানা তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারবে।

কার্যকারিতা ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা

আমেরিকা ও ব্রিটেনে ইতিমধ্যে একাধিক গর্ভবতী মহিলার উপর এই প্রযুক্তির সফল পরীক্ষা চালানো হয়েছে। একটি গবেষণায় ৬২ জন গর্ভবতীর ক্ষেত্রে এই প্যাচ থেকে পাওয়া তথ্য সাধারণ আলট্রাসাউন্ডের ফলাফলের সঙ্গে মিলিয়ে প্রায় একই রকম নির্ভুল চিত্র পাওয়া গেছে। অন্য একটি পরীক্ষায় ৫২ জন গর্ভবতী মহিলার উপর দীর্ঘ সময় নজরদারি চালিয়ে এক প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া আক্রান্ত মায়ের গর্ভস্থ শিশুর বৃদ্ধিজনিত গুরুতর সমস্যা দ্রুত চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। এর ফলে চিকিৎসকেরা সময়মতো সিজারিয়ান ডেলিভারির সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা মূলত একটি শিশুকে অকালমৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছে।

বর্তমানে প্রযুক্তিটি ‘প্রুফ অফ কনসেপ্ট’ অর্থাৎ কার্যকারিতা যাচাইয়ের প্রাথমিক ধাপে রয়েছে। গর্ভের শিশু নড়াচড়া করলেও যাতে সিগন্যাল হারিয়ে না যায়, সেজন্য এতে বিশেষ অ্যালগরিদম ও ইলেকট্রনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এটি এখনও সম্পূর্ণ ওয়্যারলেস বা তারহীন নয় এবং প্রথমবার শরীরে বসানোর জন্য সাধারণ আলট্রাসাউন্ডের সাহায্য প্রয়োজন হয়। বিজ্ঞানীরা এখন এর একটি সম্পূর্ণ পোর্টেবল ও ওয়্যারলেস সংস্করণ তৈরির কাজ করছেন, যাতে মায়েরা বাড়িতে সাধারণ দৈনন্দিন কাজের মধ্যেই এটি সহজে ব্যবহার করতে পারেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রত্যন্ত ও উন্নয়নশীল অঞ্চল যেখানে নিয়মিত উন্নত আলট্রাসাউন্ড বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব রয়েছে, সেখানে এই সাশ্রয়ী ও সহজ প্রযুক্তি গর্ভাবস্থার ঝুঁকি কমাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *