ছাব্বিশের বিপর্যয়ের পর তৃণমূলে তীব্র গৃহযুদ্ধ, সরাসরি অভিষেককে কাঠগড়ায় তুললেন কল্যাণ!

ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের দীর্ঘদিনের কোন্দল এবার প্রকাশ্য বিদ্রোহের রূপ নিয়েছে। নবীন বনাম প্রবীণের যে ঠান্ডা লড়াই দলের ভেতরে ধিকিধিকি জ্বলছিল, তা এখন সম্পূর্ণ অনাবৃত। এক নজিরবিহীন এবং বিস্ফোরক পদক্ষেপে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন শ্রীরামপুরের বর্ষীয়ান সাংসদ তথা প্রবীণ আইনজীবী-রাজনীতিক কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। দেশের রাজধানী দিল্লি থেকে দাঁড়িয়ে তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, কলকাতা পুরসভায় দলের হেভিওয়েট নেতাদের এই হাই-প্রোফাইল ইস্তফার জন্য অন্য কেউ নন, স্বয়ং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ই দায়ী।
কলকাতার পুরভবনে ঘটে যাওয়া এক জোড়া ইস্তফাই মূলত এই ক্ষোভের বারুদ উস্কে দিয়েছে। সম্পূর্ণ সমন্বয় রেখে একসঙ্গে পুরসভায় গিয়ে পদত্যাগ করেন দুই হেভিওয়েট কাউন্সিলর। ৯৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তথা দলের পরিচিত মুখ ও মুখপাত্র অরূপ চক্রবর্তী পুরসভার অ্যাকাউন্টস কমিটির সদস্যপদ থেকে এবং ১০৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সুশান্ত ঘোষ পুরসভার বরো চেয়ারম্যানের পদ থেকে ইস্তফা দেন। নির্বাচনে হারের আবহে এই দুই নেতার একসঙ্গে ইস্তফাপত্র জমা দেওয়া বর্তমান শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এক প্রকার অনাস্থা প্রকাশ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
অভিষেকের অনুগামী সংস্কৃতি নিয়ে তীব্র তোপ
এই জোড়া ইস্তফাকে হাতিয়ার করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অনুগামী’ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শাণিয়েছেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। পোড়খাওয়া প্রবীণ নেতাদের কোণঠাসা করে অভিষেক যেভাবে তরুণ তুর্কিদের দলের শীর্ষ স্তরে নিয়ে এসেছিলেন, তাঁদের যোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে অভিষেকের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত অরূপ চক্রবর্তীর দিকেই তাঁর প্রধান তির। ক্ষোভ উগরে দিয়ে শ্রীরামপুরের সাংসদ মন্তব্য করেছেন যে, অভিষেক যাঁদের নেতা করেছেন, তাঁরাই এখন ওঁর বিরুদ্ধে বলছেন। অরূপ চক্রবর্তীর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, যিনি এতদিন সারা রাজ্যে বড় বড় বক্তৃতা করে বেড়িয়েছেন, তিনি আজ কেন পালাচ্ছেন?
ঘটনার কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাব
তৃণমূলের এই বেনজির সংঘাতের মূল কারণ ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে দলের শোচনীয় পরাজয় এবং তার জেরে তৈরি হওয়া নেতৃত্ব সংকট। দলের একাংশের মতে, প্রবীণ নেতাদের অভিজ্ঞতাকে অবজ্ঞা করে তরুণ ও নতুন মুখদের অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়াই এই বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ।
এই প্রকাশ্য বিদ্রোহের ফলে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক কাঠামোয় বড় ধরনের ফাটল ধরার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দলের সর্বোচ্চ স্তরে এই ‘পারমাণবিক বিস্ফোরণ’ নিচুতলার কর্মীদের মনোবল আরও ভেঙে দিতে পারে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং কর্তৃত্বের ওপর এই সরাসরি আঘাত দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে, যা আগামী দিনে শাসক শিবিরের জন্য আরও বড় বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।