জল জমে মস্তিষ্কে, ফুসফুসে, বিচারবুদ্ধিও লোপ পায়! ঠিক কতটা ভয়ঙ্কর এভারেস্টের ‘ডেথ জোন’

জল জমে মস্তিষ্কে, ফুসফুসে, বিচারবুদ্ধিও লোপ পায়! ঠিক কতটা ভয়ঙ্কর এভারেস্টের ‘ডেথ জোন’

বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টে এখন পর্বতারোহণের মরশুম একেবারে তুঙ্গে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮,৮৪৯ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এই শৃঙ্গে পা রাখার স্বপ্ন নিয়ে প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত পর্বতারোহী নিজেদের জীবন বাজি রেখে ছুটে আসেন। তবে এভারেস্টের চূড়ার ঠিক আগের অংশটি শুধু যে দুর্গম তা-ই নয়, সেটি আসলে বেঁচে থাকার জন্য এক চরম প্রতিকূল এলাকা। ৮,০০০ মিটারের ওপরের এই অঞ্চলটি চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং পর্বতারোহণের ভাষায় ‘ডেথ জোন’ বা মৃত্যু অঞ্চল নামে পরিচিত, যেখানে অক্সিজেনের তীব্র অভাব ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এ যাবৎকাল ৩৪০ জনেরও বেশি পর্বতারোহী প্রাণ হারিয়েছেন। ২০২৬ সালের চলমান মরশুমেও এই মৃত্যু অঞ্চলে এ পর্যন্ত অন্তত পাঁচ জন পর্বতারোহীর মৃত্যুর নির্মম খবর মিলেছে, যার মধ্যে দু’জন ভারতীয়ও রয়েছেন।

কী এই ‘ডেথ জোন’ ও হাইপোক্সিয়ার মরণকামড়

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ঠিক ৮,০০০ মিটার উচ্চতায় শুরু হওয়া এই ডেথ জোনে বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ সমতলের তুলনায় মাত্র এক-তৃতীয়াংশ হয়ে যায়। এত কম অক্সিজেনের সঙ্গে মানবদেহ কোনোভাবেই খাপ খাইয়ে নিতে পারে না। ফলে এখানে পা রাখামাত্রই আরোহীদের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। হৃৎপিণ্ডের কার্যক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায় এবং হাত-পায়ের পেশির নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়ে। এই অঞ্চলের সবথেকে বড় আতঙ্ক হলো ‘হাইপোক্সিয়া’, যা মানবদেহের কোষে ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে অক্সিজেন সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। কৃত্রিম অক্সিজেন সিলিন্ডার ছাড়া এই উচ্চতায় একজন মানুষ মাত্র চার মিনিটে জ্ঞান হারাবে এবং ছয় মিনিটের মধ্যে তার নিশ্চিত মৃত্যু ঘটবে। তীব্র হাইপোক্সিয়া মানুষের মস্তিষ্কে আঘাত হানায় পর্বতারোহীরা তীব্র বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েন এবং সুরক্ষার জন্য দড়ির সঙ্গে হুক আটকানোর মতো অতি প্রয়োজনীয় প্রাথমিক পদক্ষেপের কথাও ভুলে যান।

মানবদেহের ওপর মারাত্মক প্রভাব ও ট্রাফিক জ্যামের বিপদ

এই চরম উচ্চতায় অক্সিজেনের অভাবে ‘হাই অল্টিটিউড সেরিব্রাল এডিমা’ বা মস্তিষ্কে জল জমে তা ফুলে উঠতে পারে, যার ফলে হ্যালুসিনেশন ও কোমা দেখা দেয়। একইভাবে ফুসফুসে জল জমে ‘হাই অল্টিটিউড পালমোনারি এডিমা’ হয়ে তীব্র শ্বাসকষ্ট ও রক্তমিশ্রিত কাশি শুরু হয়। শরীর সচল রাখতে মানবদেহ তখন নিজের ভেতরের চর্বি ও পেশি গ্রাস করতে শুরু করে এবং রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া হাত-পায়ের আঙুল থেকে রক্ত টেনে নেওয়ায় দ্রুত ফ্রস্টবাইট ঘটে। সাউথ কোলের ‘ক্যাম্প ফোর’ থেকে শুরু হওয়া এই চূড়ান্ত লড়াইয়ে আরোহীদের মাইনাস ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নীচের ঠান্ডা ও ঘণ্টায় প্রায় ১০০ কিলোমিটার বেগের ঝোড়ো হাওয়ার মধ্যে টানা ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা চড়াই ভাঙতে হয়। এর ওপর ২০২৬ সালের এই মরশুমে নেপালের দিক থেকে এক দিনেই রেকর্ড ২৭৪ জন পর্বতারোহী চূড়ায় ওঠার চেষ্টা করায় ডেথ জোনের ভেতরে বিপজ্জনক ট্রাফিক জ্যামের সৃষ্টি হয়েছে। এই উচ্চতায় দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার অর্থই হলো মূল্যবান অক্সিজেন ফুরিয়ে আসা এবং শরীর দ্রুত অবশ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া।

নেমে আসার পথে বাড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি

পর্বতারোহণের ইতিহাস অনুযায়ী, চূড়ায় ওঠার চেয়ে সেখান থেকে নীচে নেমে আসার পথেই সবথেকে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। চূড়ায় পৌঁছনোর পর আরোহীদের শরীরের সমস্ত শক্তি শেষ হয়ে যায়, অক্সিজেন সিলিন্ডার খালি হতে শুরু করে এবং মানসিক সতর্কতা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। এই চরম ক্লান্তির কারণে আরোহীরা সঠিকভাবে চিন্তাভাবনা করার বা হাত-পায়ের ভারসাম্য রাখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। লাইফ-লাইনের দড়িটি ঠিকমতো আটকাতে না পারা বা একটি সামান্য পা হড়কানোর মতো ছোট ভুলও মুহূর্তের মধ্যে জীবন কেড়ে নেয়। চলতি বছরেও যে সমস্ত পর্বতারোহী প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই চূড়া ছুঁয়ে নামার সময় ডেথ জোনের ভেতরে এবং হিলারি স্টেপের কাছাকাছি মারা যান। ৮,০০০ মিটারের ওপরের ওই মৃত্যু উপত্যকায় মানুষের বেঁচে থাকাটা সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতির দয়ার ওপর নির্ভরশীল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *