কয়লা বিক্রেতা থেকে বিলাসবহুল প্রাসাদের মালিক, বর্ধমানের বেতাজ বাদশা খোকন দাস অবশেষে শ্রীঘরে!

বর্ধমান দক্ষিণের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক খোকন দাসের গ্রেপ্তারির খবর আসতেই ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। একই সঙ্গে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। রবিবার উত্তরপ্রদেশ থেকে পুলিশি জালে ধরা পড়েন এই প্রভাবশালী নেতা। ভোট পরবর্তী হিংসা, বেআইনি কারবারসহ একাধিক গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত খোকন দাসের এই পরিণতিতে কাঞ্চননগরে তাঁর বাড়ির সামনে সাধারণ মানুষের আবির খেলা ও লাড্ডু বিলির মতো নজিরবিহীন উল্লাসের দৃশ্য দেখা গেছে।
সাধারণ ভ্যানচালক থেকে ক্ষমতার শীর্ষে
খোকন দাসের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উত্থান এক রূপকথার মতো, তবে তা বিতর্কে মোড়া। একসময় ভ্যানের ঠেলাগাড়িতে বাড়ি বাড়ি কয়লা পৌঁছে দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। এরপর রাজনীতিতে যোগ দিয়ে বাম আমলেই বর্ধমান পুরসভার তৃণমূল কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ২০১৩ সালে পুনরায় কাউন্সিলর হওয়ার পর পুরপ্রধানের আড়ালে তিনিই হয়ে ওঠেন পুরসভার আসল নিয়ন্ত্রক বা ‘ডিফ্যাক্টো’ চেয়ারম্যান। এই ক্ষমতার অপব্যবহার করেই বেআইনি বালি কারবার, চড়া সুদের ব্যবসা, ঠিকাদারি এবং অবৈধ নির্মাণের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ। সাধারণ কয়লা বিক্রেতা থেকে রাতারাতি বিশাল ‘সাতমহলা’ বাড়ি, বিলাসবহুল গাড়ি এবং বাইপাসের ধারে বিপুল সম্পত্তির মালিক বনে যান তিনি। এমনকি প্রতি বছর কাঞ্চন উৎসবে বলিউড তারকাদের এনে কোটি কোটি টাকা ওড়াতেন বলেও জানা গেছে।
আইনের জাল ও পলায়নের অবসান
খোকন দাসের বিরুদ্ধে কেবল আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগই ছিল না, ছিল চরম হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডের রেকর্ডও। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন পরবর্তী হিংসায় বর্ধমান শহরে ব্যাপক ভাঙচুর, হামলা ও মানুষকে ঘরছাড়া করার নেপথ্যে তাঁর নাম জড়ায়। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর ছিল যে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন তাদের রিপোর্টে খোকন দাসকে ‘কুখ্যাত অপরাধী’ (নটোরিয়াস ক্রিমিনাল) হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। সিবিআই তদন্তের মুখোমুখি হলেও দীর্ঘদিন তিনি অধরা ছিলেন। সম্প্রতি রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁর বিরুদ্ধে পুরনো ও নতুন অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তের গতি বাড়ে। গ্রেফতারি এড়াতে উত্তরপ্রদেশে পালিয়ে গিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি, অবশেষে সেখান থেকেই তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া ও রাজনৈতিক প্রভাব
তৃণমূলের এই দাপুটে প্রাক্তন বিধায়কের পতনে বর্ধমানের কাঞ্চননগরে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে। খোকন দাসের অত্যাচারে দীর্ঘদিন ধরে অতিষ্ঠ স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁর গ্রেফতারির খবর ছড়াতেই রাস্তায় নেমে আসেন। সাউন্ড বক্সে ‘খোকন চোর’ গান বাজিয়ে নাচগান করেন এলাকাবাসী। গেরুয়া আবির খেলা এবং লাড্ডু বিতরণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ তাঁদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন। এই গ্রেফতারি বর্ধমান অঞ্চলের বালি ও ভূগর্ভস্থ মাফিয়া চক্রের ওপর একটি বড় আঘাত বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রশাসনের এই কড়া পদক্ষেপের ফলে এলাকায় আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হবে এবং অপরাধীদের কাছে একটি কড়া বার্তা যাবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।