প্রতিরক্ষায় আত্মনির্ভর ভারত, বিদেশি সাহায্য ছাড়াই তৈরি হচ্ছে ১০০০ কিমি পাল্লার কামিকাজে ড্রোন

বিশ্বের সামরিক মানচিত্রে নিজেদের ক্ষমতা আরও জোরদার করতে বড়সড় পদক্ষেপ নিল ভারত। এবার কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের সাহায্য ছাড়াই সম্পূর্ণ নিজস্ব নকশায় ১,০০০ কিলোমিটার পাল্লার ‘কামিকাজে’ বা আত্মঘাতী ড্রোন তৈরিতে হাত দিয়েছে নয়াদিল্লি। মহারাষ্ট্রের পুণের একটি বেসরকারি প্রতিরক্ষা সংস্থা এনআইবিই (NIBE) লিমিটেড এই দূরপাল্লার মানববিহীন সামরিক যানটি নির্মাণের চ্যালেঞ্জ নিয়েছে। এই প্রকল্প সফল হলে আমেরিকা, রাশিয়া ও চিনের মতো প্রথম সারির দেশগুলির সঙ্গে একসারিতে চলে আসবে ভারত।
ব্রহ্মসের বিকল্প ও কার্যকারিতা
ভারতীয় ফৌজের হাতে বর্তমানে রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে তৈরি ‘ব্রহ্মস’ সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যা গত ২০২৫ সালের মে মাসে ‘অপারেশন সিন্ধু’-তে পাকিস্তানের ১১টি বায়ুসেনা ঘাঁটি ধ্বংসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। তবে ব্রহ্মসের স্থল ও নৌ সংস্করণের পাল্লা ৮০০ কিলোমিটার এবং বায়ুসেনার সংস্করণের পাল্লা আরও কম। সেই তুলনায় এই নতুন ড্রোন ১,০০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে অনায়াসে আঘাত হানতে পারবে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের বিপুল খরচ বহন করা কঠিন। সেই তুলনায় এই আত্মঘাতী ড্রোন তৈরিতে খরচ অনেক কম হবে। পাশাপাশি, ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রের ‘রিয়্যাল টাইম ডেটা’ বা তাৎক্ষণিক তথ্য পাওয়া যায় না, যা এই ড্রোনের সাহায্যে অনায়াসে কন্ট্রোল রুমে পাঠানো সম্ভব হবে। শত্রুর অবস্থান ও জ্বালানি ডিপোর তথ্য লাইভ পাওয়ায় সেনা কমান্ডারদের কৌশল নির্ধারণ সহজ হবে। এই ড্রোনে শত্রুর রাডারকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য ‘স্টেলথ’ প্রযুক্তি এবং নিজস্ব দিকনির্ণয়কারী ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।
ইউরোপের বাজারে ভারতের ‘কাল ভৈরব’
অন্য দিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সম্পন্ন ‘কাল ভৈরব’ নামের একটি ঝাঁক বেঁধে হামলাকারী ড্রোন তৈরি করেছে বেঙ্গালুরুর সংস্থা ‘ফ্লাইং ওয়েজ ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেস’ (FWDA)। এই প্রথম ভারতের কোনো সামরিক ড্রোন দেশের বাইরে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত হতে চলেছে। পর্তুগালের লিসবনের সংস্থা ‘স্কেচপিক্সেল এলডিএ’-র সঙ্গে যৌথ চুক্তিতে ‘অপারেশন ৭৭৭’-এর আওতায় এই উৎপাদন চলবে। ৩,০০০ কিলোমিটার পাল্লার এই ড্রোন টানা ৩০ ঘণ্টা আকাশে ভেসে থাকতে পারে এবং ৫ কেজি বিস্ফোরক বহনে সক্ষম।
পর্তুগালকে বেছে নেওয়ার নেপথ্যে ভারতের কৌশলগত কারণ রয়েছে। পর্তুগাল মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট নেটোর (NATO) সদস্য হওয়ায় এই বাণিজ্যিক উৎপাদনের মাধ্যমে ভারত নেটোর উন্নত প্রযুক্তিগত বাস্তুতন্ত্রে প্রবেশাধিকার পাবে। এর ফলে ইউরোপের বাজারে ভারতের অস্ত্র ব্যবসার পথ প্রশস্ত হবে, যা গ্রিস ও সাইপ্রাসের বাজারে পা জমাতে এবং পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের বন্ধু রাষ্ট্র তুরস্কের ওপর চাপ বাড়াতে সাহায্য করবে। এছাড়া, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দেশের মাটিতে উৎপাদন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বিদেশের নিরাপদ ঘাঁটিতে উৎপাদন প্রক্রিয়া সচল রাখা যাবে, যা ভারতের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করবে।