গণিতের জাদুতে কোরিয়ার সেরা তারকাদের চেয়েও বেশি আয় শিক্ষকের!

গণিতের জাদুতে কোরিয়ার সেরা তারকাদের চেয়েও বেশি আয় শিক্ষকের!

বিশ্বের বিনোদন জগতে এখন দক্ষিণ কোরিয়ার পপতারকা কিংবা কোরিয়ান ড্রামার অভিনেতা-নেত্রীদের জয়জয়কার। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো, এই দেশে একজন গণিত শিক্ষকের আয়ের কাছে জনপ্রিয় ফুটবল তারকা কিংবা চলচ্চিত্র তারকাদের উপার্জনও যেন নস্যি! দক্ষিণ কোরিয়ার এমনই এক ‘সুপারস্টার’ শিক্ষক হ্যুন উ-জিন, যিনি গণিতের জটিল ধাঁধা মিলিয়ে আজ বিপুল সম্পত্তির মালিক। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এই শিক্ষকের বার্ষিক আয় ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৩৮ কোটি টাকা, যা প্রিমিয়ার লিগ খেলা বিখ্যাত কোরিয়ান ফুটবলার সন হিউং-মিনের চেয়েও অনেক বেশি।

নেপথ্যে ‘সুনেয়ুং’ পরীক্ষা এবং ‘স্কাই’ ছোঁয়ার স্বপ্ন

গণিত শিক্ষকের এই আকাশছোঁয়া চাহিদার পেছনে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি অত্যন্ত কঠিন প্রবেশিকা পরীক্ষা, যার নাম ‘সুনেয়ুং’ বা ‘কলেজ স্কলেস্টিক এবিলিটি টেস্ট’ (সিএসএটি)। প্রতি বছর নভেম্বর মাসে আয়োজিত এই পরীক্ষার ওপর নির্ভর করে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ। দেশের শীর্ষ সারির তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়—সিওল ন্যাশনাল, কোরিয়া ইউনিভার্সিটি এবং ইওনসেই ইউনিভার্সিটি (যাদের আদ্যাক্ষর মিলিয়ে বলা হয় ‘স্কাই’)—এ ভর্তির সুযোগ পাওয়ার জন্য প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় বসেন। সন্তানদের এই ‘স্কাই’ বিশ্ববিদ্যালয়ের চূড়ায় পৌঁছে দিতে অভিভাবকেরা তাঁদের জীবনের জমানো পুঁজির সিংহভাগই ঢেলে দেন নামী গণিত শিক্ষকদের পেছনে। ৯ ঘণ্টাব্যাপী চলা এই পরীক্ষার গুরুত্ব এতটাই বেশি যে, পরীক্ষার দিন দেশটির বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল পর্যন্ত সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছানোর সুবিধার্থে রাস্তায় বিশেষ তৎপরতায় নিয়োজিত থাকে পুলিশ বাহিনী।

‘কিলার কোশ্চেন’ ও কোটিপতি শিক্ষক

সুনেয়ুং পরীক্ষার মাধ্যমে মূলত দেশের বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ চালিকাশক্তি বা সিইও-দের বাছাই করা হয়। ফলে এর প্রশ্নপত্রে থাকে কল্পনাতীত কঠিন সব অঙ্ক, যা ‘কিলার কোশ্চেন’ নামে পরিচিত। নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি স্কুলের শিক্ষকেরা এই ধরনের জটিল প্রশ্ন পাঠ্যক্রমের বাইরে গিয়ে শেখাতে পারেন না। আর এই সুযোগেই বাজার গরম করে তোলেন বেসরকারি কোচিং সেন্টারের শিক্ষকেরা। স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতক ডিগ্রিধারী শিক্ষক হ্যুন উ-জিন এই কঠিন প্রশ্নগুলোর সহজ সমাধানের কৌশল শিখিয়ে বিপুল জনপ্রিয় হয়েছেন। তাঁর লেখা গণিতের বই ‘নিউরোন’ প্রতি বছর প্রায় ১০ লক্ষেরও বেশি কপি বিক্রি হয়।

ভবিষ্যতের প্রভাব ও শিক্ষার নতুন রূপ

এই তীব্র প্রতিযোগিতার জেরে দক্ষিণ কোরিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থায় এক নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব দৃশ্যমান হচ্ছে। ভালো ফল করার তাগিদে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্কুল ছেড়ে নামী গৃহশিক্ষক বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। অভিভাবকেরা বিপুল অর্থ খরচ করে সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার মানসিক শান্তি পেলেও, এর ফলে শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ তীব্রতর হচ্ছে। একই সাথে তৈরি হচ্ছে শিক্ষার এক আসাম বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা, যা আগামী দিনে দেশটির সাধারণ পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার পথকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *