মরুভূমির বুকে চিনের রহস্যময় অক্টোপাস দুর্গ, আমেরিকা ও ভারতের কপালে চিন্তার ভাঁজ

শিংজিয়াং প্রদেশের দুর্গম তাকলামাকান মরুভূমির বুকে অত্যন্ত গোপনে এক দানবীয় সামরিক পরিকাঠামো গড়ে তুলেছে চিনা লালফৌজ বা পিপল্স লিবারেশন আর্মি (পিএলএ)। ব্রিটিশ সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রকাশিত সাম্প্রতিক কিছু উপগ্রহচিত্রে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। উপগ্রহচিত্রে দেখা গেছে, মরুভূমির বুকে তৈরি হয়েছে এক অষ্টভুজাকৃতি বা ‘অক্টোপাস’ দুর্গ, যার নিচে মজুত করা হচ্ছে গণবিধ্বংসী পরমাণু অস্ত্র। বেজিংয়ের এই গোপন সামরিক তৎপরতা প্রকাশ্যে আসতেই বিশ্বজুড়ে শোরগোল পড়ে গেছে, যা ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
মরুভূমির বুকে পরমাণু ‘পাতাললোক’
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, তাকলামাকান মরুভূমির ভূগর্ভস্থ সাইলো বা নলাকার উৎক্ষেপণ কেন্দ্রে আগে থেকেই পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) মজুত করে রেখেছিল চিন। এবার সেই সাইলো ক্ষেত্রকে কেন্দ্র করেই গড়ে তোলা হয়েছে দুটি স্বতন্ত্র ‘অক্টোপাস দুর্গ’। উপগ্রহচিত্র অনুযায়ী, এই দুর্গ দুটি মূল সাইলো এলাকা থেকে যথাক্রমে ১৪০ ও ২৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
বিগত প্রায় ছয় বছর ধরে অত্যন্ত গোপনে এই পরিকাঠামো নির্মাণের কাজ চালাচ্ছে পিএলএ। এই সুবিশাল এলাকায় ৮০টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র (লঞ্চপ্যাড), কয়েকশো বাঙ্কার, সেনাছাউনি, কমান্ড সেন্টার এবং সামরিক যান রাখার সুনির্দিষ্ট জায়গা তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যান, অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ইলেকট্রনিক রণকৌশলের নানাবিধ সরঞ্জাম।
ইউক্রেন-ইরান যুদ্ধ থেকে শিক্ষা ও বেজিংয়ের কৌশল
সামরিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সাম্প্রতিক ইউক্রেন এবং ইরান যুদ্ধ চাক্ষুষ করার পরেই এই দুর্গের নির্মাণকাজে ব্যাপক গতি এনেছে বেজিং। ওই দুটি সংঘাতের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রতিপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্রগুলি ধ্বংস করে শুরুতেই তাদের পঙ্গু করে দেওয়ার কৌশল নেওয়া হয়েছিল। ভবিষ্যৎ যুদ্ধে নিজেদের পরমাণু অস্ত্রভাণ্ডারকে সুরক্ষিত রাখতে এবং শত্রুর পাল্টা আঘাত এড়াতেই চিন এই দুর্ভেদ্য ‘পাতাললোক’ তৈরি করেছে, যা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ধ্বংস করা প্রায় আসাম্ভব।
তা ছাড়া, চিনের ‘হুয়োইয়ান-১’ কৃত্রিম উপগ্রহ নেটওয়ার্কের সাহায্যে শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের মাত্র ৯০ সেকেন্ডের মধ্যে তা চিহ্নিত করা সম্ভব। ধারণা করা হচ্ছে, এই দ্রুত সতর্কবার্তা পাওয়ার পর পাল্টা আণবিক প্রত্যাঘাত হানার মূল নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে তাকলামাকানের এই অক্টোপাস দুর্গ। মার্কিন পেন্টাগনের পূর্ববর্তী রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ১,০০০ আণবিক অস্ত্র তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে বেজিং। বর্তমান তৎপরতা সেই লক্ষ্যপূরণেরই অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির উদ্বেগ এবং পাল্টা কৌশল
চিনের এই সামরিক বিস্তার ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্যকে বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে আমেরিকার সঙ্গে চিনের সংঘাতের যে আবহ তৈরি হয়েছে, তাতে এই পরমাণু দুর্গ ওয়াশিংটনের মাথাব্যথার অন্যতম কারণ। সিঙ্গাপুরের ‘শাংরি-লা সংলাপে’ মার্কিন যুদ্ধসচিব পিট হেগসেথ স্পষ্ট জানিয়েছেন, চিনের এই আধিপত্যবাদ রুখতে এবং ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমেরিকা ও তার মিত্র দেশগুলো (জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপিন্স) প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়াতে প্রস্তুত।
অন্য দিকে, চিনের এই পরমাণু সক্ষমতা বৃদ্ধি ভারতের জন্যও যথেষ্ট উদ্বেগের। ২০২০ সালে লাদাখের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় (এলএসি) চিনা আগ্রাসনের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক এখনও স্বাভাবিক হয়নি। এই পরিস্থিতিতে ‘আগ্রাসী’ চিনকে চাপে রাখতে পাল্টা কৌশল নিয়েছে নয়াদিল্লিও। দক্ষিণ-চীন সাগর সংলগ্ন যে সমস্ত দেশের সঙ্গে চিনের বিরোধ রয়েছে, তাদের সামরিক ভাবে শক্তিশালী করতে হাত বাড়িয়েছে ভারত। ফিলিপিন্সের পর এবার ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো চিনের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির কাছে ভারতের তৈরি ‘ব্রহ্মস’ সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ফলে তাকলামাকানের এই ‘অক্টোপাস’ দুর্গকে ঘিরে আগামী দিনে এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে সামরিক উত্তেজনা আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।