ভোটের পর ধস রুখতে রাজপথে মমতা, তীব্র কোন্দলের মাঝেই শুরু ধর্মতলার মেগা ধর্না!

ভোটের পর ধস রুখতে রাজপথে মমতা, তীব্র কোন্দলের মাঝেই শুরু ধর্মতলার মেগা ধর্না!

বিধানসভা নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর এই প্রথম রাজপথে নামলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলীয় স্তরে নজিরবিহীন ভাঙন ও অন্তর্কলহের আবহেই মঙ্গলবার কলকাতার ধর্মতলার ওয়াই (Y) চ্যানেলে শুরু হয়েছে তৃণমূলের মেগা ধর্না কর্মসূচি। একদিকে যখন দলের ভেতরে বিধায়কদের একের পর এক অনুপস্থিতি ও বিদ্রোহ নিয়ে ‘গৃহদাহ’ চলছে, ঠিক তখনই বিজেপির বিরুদ্ধে চক্রান্তের অভিযোগ তুলে রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষায় মরিয়া আন্দোলনে নেমেছেন তৃণমূলনেত্রী।

তীব্র অন্তর্কলহ ও ভাঙন আতঙ্ক

রাজনৈতিক মহলের মতে, নির্বাচনী ফলাফলের পর থেকেই তৃণমূলের অন্দরে বিদ্রোহের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে। অতি সম্প্রতি শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহাকে বহিষ্কার করা হলেও দলের অন্দরে অস্বস্তি কমেনি, বরং বেড়েছে। বহিষ্কৃত নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় নাম না করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ও ভোটকুশলী সংস্থাকে নিশানা করে দাবি করেছেন, পুরো দলটাই একটি কর্পোরেট সংস্থা হাইজ্যাক করে নিয়েছে। দলীয় সূত্রে খবর, দলের প্রায় ৫০ জন বিধায়ক বর্তমানে বিক্ষুব্ধ এবং যেকোনো মুহূর্তে দল ছাড়তে পারেন।

এই ভাঙন যে কতটা গভীর, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা বৈঠকগুলোতে বিধায়কদের ক্রমহ্রাসমান উপস্থিতি থেকে। গত ৬ মে কালীঘাটের বৈঠকে ৮০ জন জয়ী বিধায়কের মধ্যে ৭১ জন উপস্থিত থাকলেও, ১৯ মে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৬৫-তে। আর গত ৩১ মে-র বৈঠকে তা মাত্র ২০ জনে গিয়ে ঠেকেছে। পরিষদীয় দলের এই ব্যাপক ফাটল আটকাতে এবং দলের রাশ ধরে রাখতে ধর্নার ঠিক আগেই কালীঘাটে কুণাল ঘোষ, মদন মিত্র, দোলা সেন, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়দের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন তৃণমূলনেত্রী। কুণাল ঘোষ স্পষ্ট ভাষায় দলবদলুদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে আখ্যা দিলেও শীর্ষ নেতৃত্বের উদ্বেগ কাটছে না।

ধর্নামঞ্চে মমতার হুঙ্কার ও পাশে থাকা সৈনিকেরা

প্রশাসনের সঙ্গে দীর্ঘ টানাপোড়েন ও স্থান পরিবর্তনের নাটক শেষে শর্তসাপেক্ষে ওয়াই চ্যানেলে মাত্র দুই ঘণ্টার জন্য এই ধর্নার অনুমতি পায় তৃণমূল। সেখানে দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি তোপ দাগেন পদ্ম শিবিরের বিরুদ্ধে। তাঁর অভিযোগ, দিল্লি থেকে বিজেপি সরকার কলকাঠি নেড়ে এবং ভয় ও প্রলোভন দেখিয়ে তৃণমূলকে ভেঙে দেওয়ার চক্রান্ত করছে। ফলতার নির্বাচনী ফলাফলে কারচুপির অভিযোগ তুলে তিনি স্পষ্ট জানান, ভয় দেখিয়ে তৃণমূলকে দুর্বল করা যাবে না, আন্দোলন চলবে।

দলে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যেও এই সংকটের দিনে নেত্রীর পাশে ধর্নামঞ্চে হাজির থাকতে দেখা গেছে প্রবীণ ও বিশ্বস্ত নেতৃত্বকে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মদন মিত্র, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ইন্দ্রনীল সেন, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, মালা রায়, নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, ডেরেক ও ব্রায়েন এবং কৃষ্ণা চক্রবর্তী। কর্মী-সমর্থকদের ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে দলনেত্রী বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন যে, পরিস্থিতি যতই প্রতিকূল হোক, তিনি মাঠ ছাড়ছেন না। তবে এই আন্দোলনের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত তৃণমূলের অন্দরের এই মহাসংকট ও সম্ভাব্য ভাঙন কতটা ঠেকানো যাবে, তা নিয়েই এখন রাজ্য রাজনীতিতে জোর গুঞ্জন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *