মহিলাদের প্রকল্পে পুরুষের নাম লেখিয়ে জালিয়াতি, নদিয়ায় হদিস মিলল ১৭৩ ‘লক্ষ্মী’ছেলের!

মহিলাদের প্রকল্পে পুরুষের নাম লেখিয়ে জালিয়াতি, নদিয়ায় হদিস মিলল ১৭৩ ‘লক্ষ্মী’ছেলের!

মহিলাদের আর্থিক সহায়তার জন্য বরাদ্দ সরকারি প্রকল্পের সুবিধা নিচ্ছেন পুরুষেরা! নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগর-২ ব্লকে অন্নপূর্ণা যোজনার তালিকা ঝাড়াই-বাছাই করতে গিয়ে এমনই এক নজিরবিহীন জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। এই একটি মাত্র ব্লক থেকেই অন্তত ১৭৩ জন এমন পুরুষের সন্ধান মিলেছে, যাঁরা মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পের টাকা মাসের পর মাস নিজেদের অ্যাকাউন্টে তুলে আসছিলেন।

তদন্তে বিশেষ দল ও আর্থিক দুর্নীতির মামলা

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে, অর্থাৎ বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক দু’মাস আগে থেকে নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই ভুয়ো উপভোক্তাদের তালিকায় নাম তোলা হয়েছিল। সম্প্রতি রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রাপকদের নতুন ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’-র আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হতেই এই বড়সড় অনিয়ম ধরা পড়ে। কৃষ্ণনগর-২ ব্লকের বিডিও ইতিমধ্যেই এই ১৭৩ জন ভুয়ো প্রাপকের নাম তালিকা থেকে বাতিল করার জন্য জেলাশাসকের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন। এই জালিয়াতি চক্রে সরকারি যোগসাজশের অভিযোগে ভোলা শীল নামে বিডিও অফিসের এক কর্মীকে কারণ দর্শানোর (শো কজ) নোটিশ পাঠানো হয়েছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতর।

এই ঘটনা কেবল একটি জেলার একটি ব্লকেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং রাজ্যজুড়ে এর শিকড় ছড়িয়ে রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুরেই এমন প্রায় তিন হাজার ভুয়ো কেস পাওয়া যেতে পারে। জালিয়াতির উৎস ও এর গভীরতা খতিয়ে দেখতে রাজ্য পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেলকে (ডিজি) একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, এই ধরনের জালিয়াতিকে সাধারণ অপরাধ হিসেবে না দেখে ‘মানি Laundering’ বা আর্থিক দুর্নীতি আইনের আওতায় এনে কড়া পদক্ষেপ করা হবে। ভোটার তালিকায় নাম না থাকা সত্ত্বেও কিংবা অনুপ্রবেশকারী ও পুরুষ হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে সামাজিক ভাতার সুবিধা দেওয়া হলো, তা নিয়ে প্রশাসনের অন্দরেও প্রশ্ন উঠেছে। ইতিপূর্বেই মুর্শিদাবাদের বহরমপুর ও রঘুনাথগঞ্জ এলাকা থেকে একাধিক ব্যক্তিকে এই জালিয়াতি চক্রের অন্যতম হোতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা প্রশাসনের মতে হিমশৈলের চূড়ামাত্র।

প্রভাব ও প্রকৃত প্রাপকদের সুরক্ষা

এই ব্যাপক অনিয়মের ফলে প্রকৃত দুঃস্থ ও যোগ্য মহিলারা যাতে তাঁদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, সে বিষয়ে কড়া অবস্থান নিয়েছে নবান্ন। ভুয়ো উপভোক্তা ছাঁটাইয়ের এই কঠোর অভিযানের কারণে সাধারণ মানুষের মনে তৈরি হওয়া উদ্বেগ দূর করতে আশ্বস্ত করেছে প্রশাসন। নতুন অন্নপূর্ণা যোজনার আবেদনকারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, তাড়াহুড়ো না করে প্রশাসনকে যাচাই প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে, যাতে কোনো জালিয়াতি ছাড়াই প্রকৃত অভাবী মানুষের কাছে বার্ষিক ৩৬ হাজার টাকার এই আর্থিক সাহায্য পৌঁছানো নিশ্চিত করা যায়। রাজ্যজুড়ে শুরু হওয়া এই শুদ্ধিকরণ অভিযান আগামী দিনে সরকারি প্রকল্পগুলোর স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীদের অধিকার সুরক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *