‘নতুন তৃণমূল’ ঝড়ে লন্ডভন্ড ঘাসফুল, ৫ জেলায় ব্যাপক ভাঙনের মুখে শাসক শিবির

রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিরোধী তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে ভাঙন ও পুনর্গঠনের জল্পনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। ‘নতুন তৃণমূল’ গঠনের প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে দুই ২৪ পরগনা, হাওড়া ও নদিয়া জেলার একাধিক বিধায়কের অবস্থান নিয়ে চরম ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। দলের অন্দরে তৈরি হওয়া ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন এই নতুন শিবিরের উত্থানে আক্ষরিক অর্থেই কোণঠাসা পুরনো নেতৃত্ব।
জেলায় জেলায় বিধায়কদের দলবদল ও সমীকরণ
উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় তৃণমূলের ১০ জন বিধায়কের মধ্যে আটজনই ঋতব্রত শিবিরের পাশে দাঁড়িয়েছেন। মধ্যমগ্রামের বিধায়ক রথীন ঘোষ, বাদুড়িয়ার বুরহান উল মুকাদ্দিন লিটন, বসিরহাট দক্ষিণের সুরজিৎ মিত্র এবং মিনাখার উষারানি মণ্ডল সরাসরি বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে দেগঙ্গার আনিসুর রহমান, স্বরূপনগরের বীণা মণ্ডল, হাড়োয়ার আব্দুল মতিন এবং বসিরহাট উত্তরের তৌসিফুর রহমান আগাম সই করে নতুন শিবিরের প্রতি সমর্থন স্পষ্ট করেছেন। এই জেলায় কেবল আমডাঙার কাশেম সিদ্দিকী ও কামারহাটির মদন মিত্র অনুপস্থিত ছিলেন।
হাওড়া জেলার নয়জন তৃণমূল বিধায়কের মধ্যে ঋতব্রত-সহ ছয়জন ইতিপূর্বেই শিবির বদল করেছেন। দক্ষিণ হাওড়ার বিধায়ক নন্দিতা চৌধুরি বর্তমানে দিল্লিতে থাকলেও, রাজ্যে ফিরে তিনি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগ দেবেন বলে জানা গেছে। তবে উলুবেড়িয়া দক্ষিণ কেন্দ্রের বিধায়ক পুলক রায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি তাঁর অবিচল আস্থা বজায় রেখেছেন।
দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ভোটের ফল প্রকাশের পর একাধিক বিধানসভা কেন্দ্র হাতছাড়া হওয়ার পর বিধায়কদের বড় অংশ ‘নতুন তৃণমূল’-এর দিকে ঝুঁকেছেন। ডায়মন্ডহারবার ও মথুরাপুর লোকসভার বেশিরভাগ বিধায়কই বিক্ষুব্ধদের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। ক্যানিংয়ের বিধায়ক পরেশ রামদাস উচ্চ নেতৃত্বের অসহযোগিতার অভিযোগ তুলেছেন। মহেশতলার শুভাশিস দাস, বারুইপুর পশ্চিমের বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় এবং পাথরপ্রতিমার সমীর জানা অবশ্য দাবি করেছেন, তাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আদর্শেই অবিচল আছেন, যদিও সমীর জানা শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে বিক্ষুব্ধদের তালিকায় সই করার কথা স্বীকার করেছেন।
নদিয়া জেলার চিত্রটি এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। জেলার তিনজন বিধায়কের মধ্যে পলাশিপাড়ার রুকবানুর রহমান নিজেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামী হিসেবে দাবি করলেও, চাপড়ার জেবের শেখ এবং কালীগঞ্জের আলিফা আহমেদের অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি।
উত্থানের কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাব
তৃণমূলের এই নজিরবিহীন ভাঙনের প্রধান কারণ হিসেবে দলের উচ্চ নেতৃত্বের প্রতি একাংশের ক্ষোভ এবং এলাকাভিত্তিক রাজনৈতিক সমীকরণ ও শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার তাগিদকে চিহ্নিত করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিধায়কদের বড় অংশ প্রকাশ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলেও, গোপনে বা প্রকাশ্যে নতুন শিবিরে সই করার ঘটনা দ্বিমুখী নীতির বহিঃপ্রকাশ।
এই গণ-দলবদলের ফলে বিধাননগর পুরনিগম ইতিমধ্যে তৃণমূলের হাতছাড়া হয়েছে এবং মেয়র কৃষ্ণা চক্রবর্তী ইস্তফা দিয়েছেন। ৫ জেলার এই সাংগঠনিক বিপর্যয় আগামী দিনে বিধানসভা এবং পুর প্রশাসনে শাসক দলের নিয়ন্ত্রণকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করতে পারে, যা রাজ্যের সামগ্রিক রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন ডেকে আনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।