ঘাটালের শিলাবতীর বুকে ১৭০ বছরের বিস্ময়কর ভাসাপুল, যাতায়াতের অনুমতি ছিল কেবল বিদ্যাসাগরের!

পশ্চিম মেদিনীপুরের ঘাটাল শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা শিলাবতী নদীর বুকে আজও ভাসছে এক আশ্চর্য সেতু। কংক্রিট বা বাঁশের বদলে ৯-১০টি নৌকোর উপর কেবল কাঠের পাটাতন বিছিয়ে তৈরি এই ‘ভাসাপুল’ আজও সাধারণ মানুষের যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম। ১৭০ বছরেরও বেশি প্রাচীন এই ভাসমান সেতুটি শুধুমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি ঘাটালবাসীর আবেগ ও দীর্ঘ ঐতিহ্যের এক জীবন্ত দলিল। নদীর জলের স্তরের ওঠানামার সঙ্গে সঙ্গে এই পুলটিও ওঠানামা করে, যে কারণে এর নামকরণ করা হয়েছে ভাসাপুল।
পরাধীন ভারতের ইতিহাস ও বিদ্যাসাগরের স্মৃতি
দেড় শতাধিক বছর আগে ব্রিটিশ আমলে নদী পারাপারের ঝক্কি এড়াতে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধার্থে এই ভাসাপুলটি নির্মাণ করা হয়েছিল। সেই সময় নদীর পশ্চিম পাড়ে ছিল ইংরেজ শাসক ওয়াটসনের রেশম কুঠি এবং পূর্ব পাড়ে ছিল তাঁদের আবাসন। নির্মাণের পর প্রথম দিকে সাধারণ ভারতীয়দের এই সেতু ব্যবহারের কোনও অধিকার ছিল না। ইতিহাস থেকে জানা যায়, সেসময় কেবল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকেই তাঁর কাজের সুবিধার্থে এবং বিশেষ সম্মান জানাতে এই পুল দিয়ে যাতায়াতের অনুমতি দিয়েছিল ইংরেজরা। পরবর্তীতে ১৯০০ সালের প্রথম দিকে এটি সাধারণ মানুষের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
পর্যটন সম্ভাবনা ও বর্তমান প্রভাব
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বন্যায় একাধিকবার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে ভাসাপুলটি বারবার তার পুরনো রূপ ফিরে পেয়েছে। বর্তমানে ঘাটাল পৌরসভার সার্বিক তত্ত্বাবধানে এই সেতুর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। এই প্রাচীন ভাসাপুল একদিকে যেমন স্থানীয়দের প্রতিদিনের যাতায়াতের সুবিধা করে দিচ্ছে, তেমনই এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আধুনিক প্রজন্মের কাছেও সমান প্রাসঙ্গিক। বর্তমানে এটি নিছক একটি সেতু নয়, বরং গবেষক, ইতিহাসবিদ ও ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এক অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও এই ভাসাপুল বাংলার প্রাচীন গ্রামীণ স্থাপত্যের এক বিরল নিদর্শন হয়ে স্বমহিমায় টিকে রয়েছে।