আধার শুধুই পরিচয়পত্র, নাগরিকত্ব বা বয়সের প্রমাণ নয়! কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনকে সুপ্রিম কোর্টের নোটিশ

আধার শুধুই পরিচয়পত্র, নাগরিকত্ব বা বয়সের প্রমাণ নয়! কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনকে সুপ্রিম কোর্টের নোটিশ

আধার কার্ড কি ভারতের নাগরিকত্ব, স্থায়ী বাসস্থান কিংবা জন্মতারিখের বৈধ প্রমাণপত্র হতে পারে? এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও সাংবিধানিক প্রশ্নের মীমাংসা করতে এবার বড়সড় পদক্ষেপ নিল সুপ্রিম কোর্ট। আধার কার্ডকে শুধুমাত্র ব্যক্তির পরিচয়ের প্রমাণ (Proof of Identity) হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখতে এবং নাগরিকত্ব বা ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে এর ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করার দাবিতে দায়ের হওয়া একটি জনস্বার্থ মামলায় (PIL) কেন্দ্রীয় সরকার, দেশের সমস্ত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI) এবং ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (UIDAI)-কে নোটিশ জারি করল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। মঙ্গলবার ভারতের প্রধান বিচারপতি (CJI) সূর্যকান্ত এবং বিচারপতি ভি. মোহনার সমন্বয়ে গঠিত এক ডিভিশন বেঞ্চ এই মেগা মামলার শুনানি করতে সম্মত হয়ে নোটিশ পাঠিয়েছে। আগামী ৭ই আগস্ট এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে।

আধার আইনের ধারা ৯ এবং বিজ্ঞপ্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন

আইনজীবী অশ্বিনী কুমার উপাধ্যায়ের দায়ের করা এই বিশেষ আবেদনে দেশের বর্তমান প্রশাসনিক ব্যবস্থায় আধারের অপব্যবহার নিয়ে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০১৬ সালের মূল আধার আইনের ৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী আধার কার্ড কোনওভাবেই নাগরিকত্ব বা স্থায়ী বাসস্থানের শংসাপত্র হতে পারে না। স্বয়ং ইউআইডিএআই (UIDAI)-এর নিজস্ব বিজ্ঞপ্তিতেও পরিষ্কার বলা রয়েছে যে, আধার শুধুই পরিচয় শনাক্তকরণের একটি নথি।

আবেদনের মূল আপত্তির জায়গাগুলি নিচে দেওয়া হলো:

  • আইন লঙ্ঘন করে ব্যাপক ব্যবহার: সুনির্দিষ্ট আইনি সীমাবদ্ধতা এবং আদালতের স্পষ্ট নির্দেশিকা থাকা সত্ত্বেও বর্তমানে স্কুল ভর্তি, সম্পত্তি কেনাবেচা বা রেজিস্ট্রেশন, জন্ম শংসাপত্র, রেশন কার্ড এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার মতো অতীব গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আধার কার্ডকে বয়স ও নাগরিকত্বের প্রধান প্রমাণ হিসেবে দেদার গ্রহণ করা হচ্ছে।
  • ভোটার তালিকায় আধারের অবৈধ অনুপ্রবেশ: নতুন ভোটার হিসেবে নাম নথিভুক্ত করার আবেদনপত্রে (ফর্ম ৬) জন্মতারিখ ও বাসস্থানের প্রমাণ হিসেবে দেদার আধার কার্ড ব্যবহার করা হচ্ছে। আবেদনকারীর দাবি, এই প্রক্রিয়া আধার আইন, ইউআইডিএআই-এর নির্দেশিকা এবং জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

শিথিল যাচাই ব্যবস্থার সুযোগ এবং অনুপ্রবেশের আশঙ্কা

আধার কার্ড তৈরির বর্তমান পরিকাঠামো এবং এর সহজলভ্যতা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড়সড় ঝুঁকি তৈরি করছে বলে সুপ্রিম কোর্টে দাবি করেছেন আবেদনকারী।

আধার নথিভুক্তিকরণের ফাঁকফোকর নিয়ে আবেদনে বলা হয়েছে:

“বর্তমানে ভারতে কমপক্ষে ১৮২ দিন ধরে বসবাসকারী যে কোনও বিদেশী নাগরিকও আধার কার্ড পাওয়ার আইনি অধিকারী। কোনও কঠিন স্ক্রুটিনি ছাড়াই সাধারণ ভাড়া চুক্তিপত্র বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দেওয়া শংসাপত্র ব্যবহার করে কমন সার্ভিস সেন্টারের মাধ্যমে আধার তৈরি করা যাচ্ছে। এই অত্যন্ত দুর্বল যাচাই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী এবং বিদেশি অভিবাসীরা সহজেই আধার কার্ড হাতিয়ে নিচ্ছে।”

অভিযোগ, এই আধার কার্ডকে প্রাথমিক হাতিয়ার বানিয়ে অনুপ্রবেশকারীরা পরবর্তীতে রেশন কার্ড, জন্ম শংসাপত্র, বাসস্থানের শংসাপত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং ভোটার আইডি কার্ডের মতো অন্যান্য সমস্ত ভারতীয় অধিকারপত্র সংগ্রহ করে ফেলছে। এই জালিয়াতির ফলে আধার ব্যবস্থার মূল বিশ্বাসযোগ্যতাই ক্ষুণ্ণ হচ্ছে না, বরং প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকেরা সরকারের কল্যাণমূলক প্রকল্প, সুযোগ-সুবিধা এবং ভর্তুকি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

সুপ্রিম কোর্টের কাছে আবেদনকারীর চূড়ান্ত দাবি

এই জনস্বার্থ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের কাছে জোরালো আর্জি জানানো হয়েছে, যাতে আধার কার্ডকে কঠোরভাবে তার বিধিবদ্ধ উদ্দেশ্যের বাইরে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। বিশেষ করে, ভোটার তালিকায় নাম তোলার ক্ষেত্রে জন্মতারিখ ও ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে আধারের ব্যবহারকে সম্পূর্ণ বেআইনি, বাতিল ও অকার্যকর ঘোষণা করার দাবি তোলা হয়েছে। সর্বোচ্চ আদালত এই বিষয়ে কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনের জবাব তলব করায় আগামী ৭ই আগস্টের শুনানির দিকে এখন তাকিয়ে রয়েছে দেশের রাজনৈতিক ও আইনি মহল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *