ইডি ও সিআইডির সাঁড়াশি জেরা আর দলের ভাঙন, নজিরবিহীন চরম চাপে জেরবার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়!

একদিকে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার ম্যারাথন জেরা, অন্যদিকে রাজ্য পুলিশের সিআইডি-র তলব। এরই মাঝে লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) ২০ জন সাংসদের নজিরবিহীন বিদ্রোহ এবং দলত্যাগের মেঘ। সবমিলিয়ে বর্তমানে চতুর্মুখী সংকটের মুখে পড়ে কার্যত জেরবার দশা তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। দলের এই ঐতিহাসিক ভাঙন প্রতিহত করতে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি পাঠিয়ে দেখা করার জরুরি সময় চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু একের পর এক ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদের চম্পটে পড়ে খোদ স্পিকারের পাঠানো ইমেল খোলারও সময় পেলেন না ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। ফলে চরম নাটকীয়তার আবহে স্পিকারের সাথে আর দেখাই হলো না তাঁর।
ইডি দফতরে ১১ ঘণ্টার ম্যারাথন জেরা ও স্পিকারের মেল মিস
গত সোমবার প্রাথমিকের নিয়োগ দুর্নীতির তদন্তের সূত্রে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি (ED) কার্যালয়ে তলব করা হয়েছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। সকাল ১১টা নাগাদ তিনি সিজিও কমপ্লেক্সে হাজিরা দেন এবং রাত ১০টা নাগাদ সেখান থেকে বের হন। টানা ১১ ঘণ্টার এই ম্যারাথন জেরা যখন চলছিল, ঠিক তখনই দিল্লির অলিন্দে তৈরি হয় এক নতুন বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি।
তৃণমূল সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার দুপুর ২টো নাগাদ লোকসভার স্পিকারের দফতর থেকে অভিষেককে একটি জরুরি ইমেল পাঠানো হয়, যেখানে ঠিক বিকেল ৪টেয় ওম বিড়লার সাথে দেখা করার সময় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ইডি-র জেরার মুখে ফোন বা মেলের দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকায় সেই মেল দেখার সুযোগই পাননি অভিষেক।
“স্পিকারের দফতর থেকে ফোন আসার পরেই আমি রাজ্যসভার দলনেতা ডেরেক ও’ব্রায়েনের সঙ্গে যোগাযোগ করি। ডেরেক জানান যে অভিষেক তখন ইডি দফতরে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি রয়েছেন, তাই তাঁর পক্ষে মেল দেখা বা জবাব দেওয়া সম্ভব নয়। এরপর আমি নিজেই পরিস্থিতি স্পষ্ট করতে দুপুর সাড়ে ৩টে নাগাদ স্পিকারের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করি।”
— কীর্তি আজাদ, তৃণমূল সাংসদ
সোমবার গভীর রাতে ইডি দফতর থেকে মুক্তি পাওয়ার পরেই কেবল স্পিকারের এই জরুরি তলব বার্তার কথা জানতে পারেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
স্পিকার ওম বিড়লাকে পাঠানো অভিষেকের ৩ পাতার চিঠি
তৃণমূল কংগ্রেসের ২০ জন লোকসভা সাংসদ বিদ্রোহী হয়ে আলাদা গোষ্ঠী গঠনের পরেই দলের রাশ শক্ত করতে রবিবারই স্পিকার ওম বিড়লাকে একটি তিন পাতার দীর্ঘ চিঠি পাঠিয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
চিঠির মূল বিষয়বস্তু নিচে তুলে ধরা হলো:
- অখণ্ড দল: চিঠিতে তৃণমূলের লোকসভার দলনেতা অভিষেক স্পষ্টভাবে দাবি করেন যে, সর্বতোভাবে তৃণমূল কংগ্রেস একটি অখণ্ড রাজনৈতিক দল এবং আইনগতভাবেও তৃণমূলের অস্তিত্ব একটাই।
- পৃথক গোষ্ঠীকে অস্বীকৃতি: তৃণমূলের সংসদীয় দলের অন্দরে যাতে কোনওরকম পৃথক বা দলছুট গোষ্ঠীকে স্পিকারের তরফে সরকারি স্বীকৃতি না দেওয়া হয়, সেই জোরালো আর্জি জানান তিনি।
- হুইপ মানার নির্দেশ: দলের মূল পরিকাঠামো বজায় রাখতে এবং দলত্যাগ বিরোধী আইনের কোপ থেকে দলকে বাঁচাতে এই চিঠিটি রবিবারই স্পিকারের বাসভবনে গিয়ে সশরীরে পৌঁছে দিয়েছিলেন তৃণমূল সাংসদ কীর্তি আজাদ এবং সাগরিকা ঘোষ। সেই সময়েই অভিষেকের পক্ষে স্পিকারের সাথে দেখা করার একটি অ্যাপয়েন্টমেন্টও চাওয়া হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত সময়ের ফেরে ভেস্তে যায়।
এবার ভবানী ভবনে সিআইডি-র সাড়ে ৬ ঘণ্টার জেরা
ইডির ধকল কাটতে না কাটতেই মঙ্গলবার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে পড়তে হলো রাজ্য পুলিশের তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি-র (CID) মুখোমুখি। তাঁর বহুল চর্চিত ‘ডিজে বাজাব’ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া একটি মামলার প্রেক্ষিতে এদিন তাঁকে ভবানী ভবনে তলব করা হয়েছিল।
আইন মেনে সিআইডি-র দেওয়া নির্ধারিত সময়ের আগেই মঙ্গলবার সকালে ভবানী ভবনে পৌঁছে যান অভিষেক। সেখানে টানা সাড়ে ৬ ঘণ্টা ধরে চলে কড়া জেরা ও বয়ান রেকর্ড। সন্ধ্যে ৬টার কিছু পরে তিনি ভবানী ভবন থেকে বের হন। তবে এই মামলায় তাঁকে আগামী দিনে আবারও জেরা করা হবে কি না, তা নিয়ে সিআইডি-র তরফে এখনও কোনও স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলেনি। একদিকে সিআইডি-র জেরা এবং অন্যদিকে ইডি ও দিল্লির সংসদীয় সংকট—সব মিলিয়ে ছাব্বিশের এই জুনে চরম রাজনৈতিক চাপের মুখে দাঁড়িয়ে তৃণমূলের এই তরুণ সেনাপতি।