অষ্টম পে কমিশনে আমূল বদলাতে পারে বেতন কাঠামো, ওল্ড পেনশন ফেরানো নিয়ে কেন বাড়ছে জটিলতা

অষ্টম পে কমিশন নিয়ে দেশজুড়ে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের মধ্যে পারদ চড়ছে। প্রায় ৫৫ লক্ষ কর্মরত কর্মী এবং ৬৯ লক্ষ পেনশনভোগী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন নতুন বেতন কাঠামোর জন্য। তবে এর মাঝেই দানা বেঁধেছে নতুন বিতর্ক। সরকারি কর্মচারী সংগঠনগুলি দীর্ঘদিন ধরে ‘ওল্ড পেনশন স্কিম’ বা পুরোনো পেনশন ব্যবস্থা (OPS) পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে আসলেও, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় তা ফিরিয়ে আনা সরকারের পক্ষে প্রায় আসাম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে অবসরের পর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এক নয়া ‘হাইব্রিড মডেল’ আনার কথা ভাবছে কেন্দ্র।
তহবিল সংকট ও বাজার ধসের আশঙ্কা
পুরোনো পেনশন ব্যবস্থা পুরোপুরি পুনর্বহাল করার ক্ষেত্রে সরকারের সামনে প্রধানত দুটি বড় জটিলতা রয়েছে। বিগত ২০ বছর ধরে ন্যাশনাল পেনশন সিস্টেম বা এনপিএস (NPS) অ্যাকাউন্টে কর্মী এবং সরকারের তরফ থেকে জমা হওয়া অর্থের পরিমাণ প্রায় ১৬.৫ লক্ষ কোটি টাকা। এই বিপুল অঙ্কের টাকা ঘরে বসিয়ে রাখা হয়নি, বরং এলআইসি, এসবিআই এবং ইউটিআই-এর মতো দেশের শীর্ষস্থানীয় রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাজারের বিভিন্ন লাভজনক ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, যদি ওল্ড পেনশন চালুর উদ্দেশ্যে এই ১৬.৫ লক্ষ কোটি টাকা হঠাৎ করে বাজার থেকে তুলে নেওয়া হয়, তবে দেশের ব্যাঙ্ক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি এক নজিরবিহীন তহবিল সংকটের মুখোমুখি হবে। এর জেরে ধসে পড়তে পারে সামগ্রিক শেয়ার বাজার, যা দেশের অর্থনীতিকে এক মারাত্মক মন্দার দিকে ঠেলে দেবে। পাশাপাশি, প্রতি বছর কোষাগার থেকে বিপুল পেনশন দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত বাজেটও সরকারের কাছে নেই। এটি করা হলে দেশের ঋণের বোঝা হু হু করে বাড়বে। ফলে ওল্ড পেনশনের বদলে কর্মচারীদের স্বস্তি দিতে ‘ইউনিফাইড পেনশন স্কিম’ (UPS) বা ‘ন্যূনতম গ্যারেন্টেড পেনশন’-এর মতো হাইব্রিড মডেলের কথা ভাবা হচ্ছে, যেখানে বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর না করেই কর্মীরা একটি নির্দিষ্ট সম্মানজনক পেনশনের নিশ্চয়তা পাবেন।
ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর বৃদ্ধি ও সম্ভাব্য বেতন কাঠামো
অষ্টম পে কমিশনের অধীনে কর্মীদের বেতন কতটা বাড়বে, তা মূলত নির্ভর করছে নতুন ‘ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর’-এর ওপর। এর আগে সপ্তম পে কমিশনে ২.৫৭ ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর কার্যকর করা হয়েছিল, যার ফলে ন্যূনতম মূল বেতন বেড়ে হয়েছিল ১৮,০০০ টাকা। এবার কর্মচারী ইউনিয়নগুলি ৩ থেকে ৫ পর্যন্ত ফিটমেন্ট ফ্যাক্টরের দাবি জানালেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাস্তবতার নিরিখে তা কিছুটা কম হতে পারে।
যদি ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর বর্তমানের ২.৫৭ থেকে বাড়িয়ে ৩.০ করা হয়, তবে প্রবেশ-স্তরের মূল বেতন ১৫-২০ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যদি ৩ ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর গৃহীত হয়, তবে আগের আমলের ১৫,০০০ টাকার মূল বেতন একলাফে বেড়ে ৪৫,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। সব মিলিয়ে নতুন পে কমিশনের হাত ধরে কর্মচারীদের মূল বেতন ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
কবে নাগাদ মিলবে বকেয়া টাকা
বর্তমানে অষ্টম বেতন কমিশনের সদস্যরা বিভিন্ন রাজ্য সফর করছেন এবং কর্মী সংগঠনগুলির দাবি ও স্মারকলিপি খতিয়ে দেখছেন। স্মারকলিপি জমা দেওয়ার সময়সীমা বাড়িয়ে ১৫ জুন, ২০২৬ পর্যন্ত করা হয়েছিল। যদিও এই কমিশনটি ১ জানুয়ারি, ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে, তবে এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা পড়তে ২০২৭ সালের জুন-জুলাই মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর সরকার যখন এই সুপারিশগুলি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করবে, তখন অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের সমস্ত বকেয়া বা অ্যারিয়ার্স কর্মচারীদের মিটিয়ে দেওয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে।