এবার ভাঙচুর করলেই মোটা টাকা জরিমানা! সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে নতুন ‘গুণ্ডা বিল’ আনছে সরকার

কলকাতা: রাজনৈতিক মিছিল, দাঙ্গা বা অবরোধের নামে সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করার দিন শেষ। অতীতে এই ধরনের ঘটনা ঘটলে কেবল ফৌজদারি মামলাতেই সীমাবদ্ধ থাকত রাজ্য সরকার। কিন্তু এবার সেই গড়িমসি কাটিয়ে কড়া আইনের পথে হাঁটছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। সোমবার বিধানসভায় পেশ হতে চলেছে ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল মেনটেন্যান্স অব পাবলিক অর্ডার (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’। এই বিল পাশ হলে সম্পত্তি নষ্টকারীদের শুধু জেলেই যেতে হবে না, গুণতে হবে মোটা অঙ্কের ক্ষতিপূরণও।
বিলটির প্রধান বৈশিষ্ট্য ও প্রভাব:
- ‘ক্লেমস কমিশন’ গঠন: বিল অনুযায়ী একটি বিশেষ ‘ক্লেমস কমিশন’ তৈরি করা হবে। এই কমিশনই ঠিক করবে ঘটনার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কত এবং কার কাছ থেকে সেই টাকা আদায় করা হবে।
- দায় শুধু ভাঙচুরকারীদের নয়: এই বিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ভাঙচুরের দায় শুধু মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের ওপর পড়বে না। যারা এই ঘটনা উস্কে দিয়েছেন, সংগঠিত করেছেন, আর্থিক মদত দিয়েছেন বা অপরাধীদের আশ্রয় দিয়েছেন, তাঁরাও সমানভাবে দায়ী হবেন। অর্থাৎ, রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারাও এর আওতায় আসতে পারেন।
- ক্ষতিপূরণের নিয়ম: সরকারি বা বেসরকারি (দোকান, ব্যক্তিগত বাড়ি, গাড়ি, কারখানা) যে কোনো সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হলে কমিশন বাজারদরের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ ধার্য করবে।
- দৃষ্টান্তমূলক অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ: শুধু প্রকৃত ক্ষতি নয়, কমিশন চাইলে ‘দৃষ্টান্তমূলক’ (exemplary damages) অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণও ধার্য করতে পারবে, যা প্রকৃত ক্ষতির দ্বিগুণ পর্যন্ত হতে পারে। পাশাপাশি, বকেয়া টাকার ওপর সুদও দিতে হবে।
- কঠোর আইন: যদি অভিযুক্ত ক্ষতিপূরণের টাকা দিতে অস্বীকার করেন, তবে সরকার তা ‘বকেয়া ভূমি রাজস্ব’ হিসেবে আদায় করবে। এক্ষেত্রে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করারও আইনি ক্ষমতা থাকবে সরকারের হাতে।
- চূড়ান্ত রায়: কমিশনের দেওয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে আপিল করা যাবে না। এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ কমিশনের নির্দেশই হবে চূড়ান্ত।
কেন এই বিল?
দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা প্রতিবাদের নামে সরকারি বাস, সরকারি অফিস, ট্রাম এমনকি ব্যক্তিগত দোকানে হামলার ঘটনা ঘটে আসছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মামলা ঝুলে থাকে, কিন্তু সরকারি সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয় না। নতুন এই বিলের মাধ্যমে সরকার মূলত ভাঙচুরকারীদের মানিব্যাগে আঘাত করতে চাইছে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট:
যদিও সরকার বলছে গণতান্ত্রিক প্রতিবাদে বাধা নেই, তবে ভাঙচুর ও নাশকতার অধিকার কারও নেই। তবুও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, এই আইন বিরোধীদের দমনে বা আন্দোলনের কণ্ঠরোধে ব্যবহৃত হতে পারে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
তবে বিলটি পাশ হলে বাংলার রাজনৈতিক আন্দোলন ও ভাঙচুরের সংস্কৃতিতে যে এক আমূল পরিবর্তন আসতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য। এখন থেকে মিছিল বা আন্দোলনে নামার আগে রাজনৈতিক দলগুলোকে অনেক বেশি সতর্ক হতে হবে, কারণ প্রতিবাদের খরচ এখন থেকে পকেট থেকেই গুণতে হতে পারে।