প্রশ্নফাঁস রুখতে আরও কঠোর আইন, ১০ কোটি পর্যন্ত জরিমানা ও কড়া সংশোধনী লোকসভায় পাশ

তীব্র রাজনৈতিক তরজা এবং বিরোধীদের ওয়াকআউটের মধ্য দিয়ে সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভায় ধ্বনিভোটে পাশ হয়ে গেল বিতর্কিত ‘পাবলিক এগজামিনেশনস (প্রিভেনশন অফ আনফেয়ার মিন্স) অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬’ (Anti Paper Leak Bill)। বুধবার দুপুরে সংসদে হট্টগোল চরমে পৌঁছলে বিরোধী সাংসদরা ওয়াকআউট করেন, যার সুযোগ নিয়ে ধ্বনিভোটে বিলটি পাশ করিয়ে নেয় সরকার পক্ষ। আগামীকাল, অর্থাৎ বৃহস্পতিবার এটি উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় পেশ করা হবে।
NEET-UG সহ দেশের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস এবং অন্যান্য অনিয়ম কঠোরভাবে রুখতে সোমবার এই সংশোধনী বিলটি পেশ করেছিল কেন্দ্র। তবে বিল পেশের আগে থেকেই সংসদে উত্তেজনা ছিল তুঙ্গে। ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে নিশানা করেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। তাঁর বিস্ফোরক অভিযোগ ঘিরে সরকার ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ শুরু হয়। NEET ইস্যুতে বিরোধী সাংসদরা স্লোগান দিতে দিতে ওয়াকআউট করেন। এর পরেই স্পিকার ওম বিড়লা বিলটি ধ্বনিভোটে পাশ করিয়ে অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেন।
নতুন সংশোধনী বিলে কী রয়েছে?
২০২৪ সালের মূল আইনটিকে আরও অনেক বেশি শক্তপোক্ত ও কার্যকর করার লক্ষ্যেই এই সংশোধনী আনা হয়েছে। সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য হল প্রশ্নফাঁস এবং সংগঠিত অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি দেওয়াল তৈরি করা। নতুন বিলে জেল ও জরিমানার পরিমাণ বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে:
- ব্যক্তিগত অনিয়মের ক্ষেত্রে: পূর্বে অনৈতিক উপায়ে পরীক্ষা পাশ বা সহায়তার জন্য ৩ থেকে ৫ বছরের জেল ও সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ টাকা জরিমানার বিধান ছিল। সংশোধনীতে তা বাড়িয়ে ৫ থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৫০ লক্ষ টাকা জরিমানা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
- সার্ভিস প্রোভাইডারদের জন্য কঠোর শাস্তি: পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কোনো সার্ভিস প্রোভাইডার বা সংস্থা অনিয়মে যুক্ত প্রমাণিত হলে এতদিন সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা জরিমানা হতো। নতুন বিলে সেই জরিমানা বাড়িয়ে সরাসরি ৫ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্যও কারাদণ্ড ও জরিমানার পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
- সংগঠিত অপরাধ চক্রে কড়া ব্যবস্থা: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি আনা হয়েছে সংগঠিত প্রশ্নফাঁস চক্রের ক্ষেত্রে। বর্তমানে ন্যূনতম ৫ বছরের জেল এবং ১ কোটি টাকা জরিমানার নিয়ম থাকলেও, নতুন বিলে ন্যূনতম সাজা বাড়িয়ে ৭ বছর এবং ন্যূনতম জরিমানা বাড়িয়ে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত করা হয়েছে।
দ্রুত বিচার ও অন্যান্য পরিবর্তন
শুধু শাস্তির পরিমাণ বাড়িয়েই ক্ষান্ত থাকছে না কেন্দ্র, বরং বিচার প্রক্রিয়াকে দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য বিশেষ ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট, বিশেষ সরকারি কৌঁসুলি নিয়োগ এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তির বন্দোবস্ত রাখা হয়েছে। সরকারের দাবি, মামলার দীর্ঘসূত্রিতা অপরাধীদের মনে ভীতি কমায়, তাই তদন্ত থেকে বিচার প্রক্রিয়া একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে শেষ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
সংসদের বাদল অধিবেশনের শুরু থেকেই এই বিলকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। মঙ্গলবার উভয় পক্ষের আলোচনার পর সংসদে আলোচনার পথ প্রশস্ত হয় এবং বুধবার চূড়ান্ত উত্তেজনার মধ্যেই বিলটি পাশ হয়। রাজ্যসভায় পাশ হয়ে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পেলে এই কঠোর আইনটি দেশজুড়ে পুরোপুরি কার্যকর হবে।