ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের কূটনৈতিক মাস্টারস্ট্রোক, একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে একাট্টা ১১ দেশ

সম্প্রতি প্রকাশিত ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলনের যৌথ ঘোষণাপত্রটি আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সদস্য দেশগুলোর বৈচিত্র্যময় স্বার্থ ও গভীর মতপার্থক্য সত্ত্বেও ভারত সম্মেলনের আয়োজক ও সভাপতি হিসেবে সফলভাবে সবাইকে একটি সর্বসম্মত বিবৃতিতে রাজি করাতে সক্ষম হয়েছে। একে বিশ্বমঞ্চে নয়াদিল্লির এক বিরাট কূটনৈতিক জয় হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
একতরফা নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্য নীতি নিয়ে কড়া বার্তা
ঘোষণাপত্রে জাতিসংঘের সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং গৌণ বাণিজ্যের ওপর জবরদস্তিমূলক বিধিনিষেধের কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের নাম উচ্চারণ করা না হলেও, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) নিয়ম এড়িয়ে অতিরিক্ত শুল্ক বা ট্যারিফ আরোপের বিরুদ্ধে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, যা ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির প্রতি ব্রিকসের শক্ত বার্তারই বহিঃপ্রকাশ।
মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও মানবিক বার্তা
সমগ্র ঘোষণাপত্রে কৌশলগত কারণে অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট দেশের নাম এড়িয়ে যাওয়া হলেও, ইজরায়েলের ক্ষেত্রে সরাসরি কড়া অবস্থান নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে গাজা ও লেবাননে চলমান সামরিক আগ্রাসনের তীব্র সমালোচনা করে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং মানবিক সাহায্য পৌঁছানোর ওপর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার প্রতিবাদ জানানো হলেও সেখানে আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রেখে কৌশলে ইরানের নাম উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকা হয়েছে।
দিল্লির দক্ষ মধ্যস্থতা ও ঐক্য
মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সদস্য ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের মতো পরস্পরবিরোধী স্বার্থের দেশকে একই টেবিলে বসিয়ে সর্বসম্মত ঘোষণা আদায় করা অত্যন্ত জটিল ছিল। রাশিয়া বা ইরান যাতে আমেরিকার বিরুদ্ধে চরম আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করতে না পারে, আবার তাদের দীর্ঘদিনের দাবিগুলোও যেন উপেক্ষিত না হয়—নয়াদিল্লি অত্যন্ত মাপা ও পরিশীলিত শব্দচয়নের মাধ্যমে সেই ভারসাম্য বজায় রেখেছে।
স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিতে অবিচল ভারত
এই জোরালো যৌথ ঘোষণা প্রকাশ পেলেও এটি ভারতের দীর্ঘদিনের স্বাধীন বৈশ্বিক নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনে না। একদিকে ফিলিস্তিনের ‘টু-স্টেট সলিউশন’-এর পক্ষে জোরালো সওয়াল, অন্যদিকে আমেরিকা ও ইজরায়েলের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্কের সমন্বয় রেখে ভারত ফের প্রমাণ করল—জটিল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতেও দক্ষতার সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে নয়াদিল্লি সম্পূর্ণ প্রস্তুত।