বালিশের পাশে ফোন? ঘুমানোর আগের এই ভুলেই অজান্তে ক্ষতি করছেন মস্তিষ্কের!

বিছানায় শুয়ে আলো নেভানোর পর ফোনটা হাতে নেওয়া এখন প্রায় সবারই দৈনন্দিন অভ্যাস। “মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্য নোটিফিকেশনটা দেখে নিই”— এই ভেবে শুরু হয় স্ক্রলিং। তারপর একের পর এক শর্টস, ইনস্টাগ্রাম রিলস, রিয়্যালিটি শোয়ের ক্লিপ কিংবা খবর দেখতে দেখতে কীভাবে যে আধ ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা কেটে যায়, তা আমরা টেরই পাই না।
কিন্তু জানেন কি, দিনের শেষে আপনার এই সামান্য অভ্যাসটি মস্তিষ্কের কতটা অপূরণীয় ক্ষতি করছে? অতি সম্প্রতি এই মারাত্মক অভ্যাস নিয়ে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন মুম্বইয়ের ‘জসলোক হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার’-এর স্নায়ুরোগ বিভাগের অধিকর্তা চিকিৎসক জয় ডি দেশাই।
শরীর বিছানায়, কিন্তু মস্তিষ্ক এখনও ‘অনলাইন’!
চিকিৎসক দেশাইয়ের মতে, দিনে ৩ ঘণ্টার বেশি ফোন ব্যবহার এবং বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর ঠিক আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ রাখা ব্রেনের কাজ করার স্বাভাবিক ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। একের পর এক নতুন ছবি, ট্রেন্ডিং ভিডিও বা উত্তেজনাপূর্ণ খবর মস্তিষ্ককে অনবরত উদ্দীপনা (Stimulation) দিতে থাকে। ফলে শরীর বিশ্রামের জন্য তৈরি হলেও, মস্তিষ্ক পুরোপুরি ‘অনলাইন’ মোডে কাজ করে চলে।
নীল আলো নয়, আসল খলনায়ক ‘ডুমস্ক্রলিং’
আমরা অনেকেই ভাবি, ফোনের পর্দার নীল আলোই (Blue Light) শুধু ঘুমের জন্য ক্ষতিকর কারণ এটি ‘মেলাটোনিন’ হরমোন ক্ষরণে বাধা দেয়। কিন্তু চিকিৎসকরা বলছেন, সমস্যার জল আরও গভীরে!
স্ক্রিন থেকে আসা আলোর চেয়েও বেশি ক্ষতিকর হলো— আপনি স্ক্রিনে ঠিক কী দেখছেন।
- একের পর এক নেতিবাচক খবর পড়তে থাকা বা ভয়াবহ ভিডিও দেখার অভ্যাসকে বলা হয় ‘ডুমস্ক্রলিং’ (Doomscrolling)।
- উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা, সোশ্যাল মিডিয়ার বিতর্ক বা নেতিবাচক খবর দেখার ফলে মস্তিষ্ক শান্ত হওয়ার বদলে আরও বেশি সক্রিয় ও উত্তেজিত হয়ে পড়ে, যা গভীর ঘুমের আমেজ এক নিমেষে নষ্ট করে দেয়।
ঘুমের সময় ব্রেনে কী ঘটে?
অনেকের ধারণা ঘুম মানে কেবল শরীরের জিরিয়ে নেওয়া। কিন্তু বিজ্ঞানের ভাষায়, ঘুমের সময় মস্তিষ্ক তার নিজের অভ্যন্তরীণ ‘সফাই অভিযান’ চালায়।
- গ্লিম্ফ্যাটিক সিস্টেমের কাজ: গভীর ঘুমের সময় মস্তিষ্কের গ্লিম্ফ্যাটিক ব্যবস্থা সারা দিনে জমা হওয়া ক্ষতিকর প্রোটিনজাত বর্জ্য ও টক্সিন পরিষ্কার করে।
- স্মৃতি সংরক্ষণ: সারাদিনের তথ্য ও স্মৃতি গুছিয়ে রাখার কাজও হয় এই সময়ে।
তাই নিয়মিত ঘুমের সময় পিছিয়ে গেলে বা ঘুম পাতলা হলে মস্তিষ্কে টক্সিন জমা হতে শুরু করে, যা দীর্ঘমেয়াদে মনোযোগের অভাব ও মারাত্মক মানসিক অবসাদের কারণ হতে পারে।
ঘুমের মান ফেরাতে চিকিৎসকের ৫টি সহজ টিপস:
১. বিছানাকে ‘ফোন ফ্রি জোন’ বানান: শোয়ার অন্তত আধ ঘণ্টা আগে ফোন দূরে রেখে দিন। প্রয়োজনে অ্যালার্ম দেওয়ার জন্য ফোনের ওপর ভরসা না করে আলাদা ঘড়ি ব্যবহার করুন। ২. বই পড়ার অভ্যাস: ফোনের আলোর বদলে বইয়ের পাতায় চোখ রাখলে মস্তিষ্ক দ্রুত শান্ত হয়। ৩. হালকা মিউজিক বা আড্ডা: ঘুমানোর আগে ফোন না ঘেঁটে হালকা সুরের গান শুনুন বা পরিবারের সঙ্গে হালকা মেজাজে কথা বলুন। ৪. মাইন্ডফুলনেস: পাহাড়ি নদী, হালকা বৃষ্টি বা প্রকৃতির শব্দের ‘হোয়াইট নয়েজ’ মনকে রিল্যাক্স করতে দারুণ সাহায্য করে। ৫. পরের দিনের কাজের তালিকা: মন থেকে মানসিক চাপ কমাতে ঘুমানোর আগে আগামীকালের কাজের তালিকা ডায়েরিতে লিখে রাখতে পারেন।
মনে রাখবেন, শরীর বিছানায় ঢাললেই কাজ শেষ নয়; পরের দিনের জন্য ব্রেনকে সতেজ রাখতে হলে রাতের ঘুমকে শান্ত ও গভীর রাখা অত্যন্ত জরুরি!