দাদু-ঠাকুমার অ্যালঝাইমার্স থাকলে আপনারও কি হবে? জেনে নিন আসল সত্যিটা
‘আমারও কি ভবিষ্যতে অ্যালঝাইমার্স হতে পারে?’—পরিবারের প্রবীণ সদস্যের অ্যালঝাইমার্স ধরা পড়লে বা নিজের টুকটাক ভুলে যাওয়ার অভ্যাস শুরু হলে অনেকেই এমন আশঙ্কায় ভোগেন। তবে আতঙ্কিত হওয়ার আগে চিকিৎসাবিজ্ঞানের আসল তথ্য জেনে নেওয়া জরুরি। চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, জিনের সঙ্গে অ্যালঝাইমার্সের সম্পর্ক নিয়ে আমরা যতটা ভয় পাই, পরিস্থিতি ততটা বিপজ্জনক নয়। জিনে এই রোগের উপস্থিতি থাকা মানেই আপনি আক্রান্ত হবেন—এমনটা কিন্তু নয়।
অ্যালঝাইমার্স কি সত্যিই বংশগত?
অনেকের ধারণা, সিস্টিক ফাইব্রোসিস বা অন্যান্য জিনগত রোগের মতো অ্যালঝাইমার্সও পিতামাতার থেকে সরাসরি সন্তানে ছড়ায়। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন:
- বংশগত কেস অত্যন্ত বিরল: অ্যালঝাইমার্সের প্রায় ৯৫ শতাংশ কেস ঘটে বয়স বৃদ্ধি ও পরিবেশগত কারণে। সরাসরি জিনগত বা বংশগত কারণে মাত্র ১ থেকে ৫ শতাংশ রোগী আক্রান্ত হন।
- আর্লি-অনসেট জিন পরিবর্তন: ৬৫ বছরের কম বয়সে যাঁদের অ্যালঝাইমার্স হয়, তাঁদের ক্ষেত্রে APP, PSEN1 বা PSEN2 জিনের মিউটেশন দায়ী থাকে।
- প্রবীণদের অ্যালঝাইমার্স: পরিবারের কারও ৭০ বা ৮০ বছর বয়সে অ্যালঝাইমার্স হওয়া মানেই যে আপনারও এই রোগ হবে, তা একেবারেই নিশ্চিত নয়।
APOE ε4 জিন ও ডিএনএ টেস্টের সত্যিটা
ডিএনএ পরীক্ষার সময় APOE ε4 জিনের বিষয়টি প্রায়ই আলোচনায় আসে। এটি লেট-অনসেট অ্যালঝাইমার্সের ঝুঁকি বাড়ায়। তবে:
- ঝুঁকি মানেই রোগ নয়: এই জিন থাকা মানেই অ্যালঝাইমার্স হওয়া অনিবার্য নয়। আবার জিন না থাকলেও রোগটি হতে পারে।
- কখন টেস্ট প্রয়োজন? কেবল অনাবশ্যক দুশ্চিন্তা মেটাতে ডিএনএ টেস্ট করা মানসিক চাপ বাড়ায়। তবে খুব অল্প বয়সে পরিবারে একাধিক সদস্যের অ্যালঝাইমার্সের ইতিহাস থাকলে বা চিকিৎসকের পরামর্শে বিশেষ থেরাপির প্রয়োজনে জেনেটিক টেস্ট করা যেতে পারে।
মূল ঝুঁকি জিন নয়, আসল কারণ ‘বয়স’
অ্যালঝাইমার্সের সবচেয়ে বড় অনুঘটক হলো বয়স। চিকিৎসকদের মতে, ৬৫ বছর বয়সের পর প্রতি ৫ বছরে অ্যালঝাইমার্স হওয়ার ঝুঁকি দ্বিগুণ হতে থাকে।
জীবনযাত্রার পরিবর্তনে ৪৫% পর্যন্ত ঝুঁকি কমানো সম্ভব
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র মতে, জিন অপরিবর্তনীয় হলেও দৈনিক অভ্যাসে কিছু বদল এনে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি প্রায় ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো বা পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব:
- নিয়মিত ব্যায়াম: সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট হাঁটা বা হালকা অ্যারোবিক্স করা।
- হৃদযন্ত্রের যত্ন: উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবিটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা।
- মস্তিষ্কের উপযোগী ডায়েট: ‘MIND’ বা মেডিটেরেনিয়ান ডায়েট মেনে খাবার খাওয়া।
- সুঅভ্যাস: প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম এবং ধূমপান ও মদ্যপান সম্পূর্ণ ত্যাগ করা।
- মানসিক সক্রিয়তা: বই পড়া, ধাঁধা মেলানো ও সামাজিকভাবে সক্রিয় থাকা।
থেরাপি ও কেয়ারগিভার-এর ভূমিকা
বয়স্কদের ক্ষেত্রে শুধু ওষুধ নয়, সঠিক পুষ্টি, ব্যায়াম ও সেন্সরি থেরাপির মাধ্যমে জীবনযাত্রার মান উন্নত করাই আধুনিক চিকিৎসার লক্ষ্য। পাশাপাশি, অ্যালঝাইমার্স রোগীর যত্ন যিনি নিচ্ছেন (Caregiver), তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।