বাংলার গণতন্ত্রে ‘ত্র্যহস্পর্শ’! এক দেশ এক ভোট থেকে ডিলিমিটেশন— কোন তিন চালে বঙ্গজয়ের ছক বিজেপির?

বাংলার গণতন্ত্রে ‘ত্র্যহস্পর্শ’! এক দেশ এক ভোট থেকে ডিলিমিটেশন— কোন তিন চালে বঙ্গজয়ের ছক বিজেপির?

নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে ‘৪০০ পার’-এর স্লোগান মুখ থুবড়ে পড়ার পর বিজেপি এবার অনেক বেশি হিসাবি এবং আক্রমণাত্মক। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি ভোটযুদ্ধে জিততে না পেরে এবার পর্দার আড়ালে তিনটি বড় কৌশলে ভারতের গণতন্ত্রের অভিমুখ বদলে দিতে চাইছে মোদি সরকার। আর এই কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। এক দেশ এক ভোট, ডিলিমিটেশন এবং বিতর্কিত এসআইআর— এই তিন সাঁড়াশি আক্রমণে বাংলাকে কোণঠাসা করার নীল নকশা তৈরি হয়েছে বলে দাবি ওয়াকিবহাল মহলের।

১. ‘এক দেশ এক ভোট’: জবাবদিহি এড়ানোর ফাঁদ?

বিজেপির প্রথম চাল ‘এক দেশ, এক ভোট’। আপাতদৃষ্টিতে একে খরচ কমানোর উপায় মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে বড় রাজনৈতিক অভিসন্ধি। ভারতে বারবার ভোট হয় বলেই শাসকদলকে জনগণের কাছে বারংবার জবাবদিহি করতে হয়। এই প্রস্তাব কার্যকর হলে পাঁচ বছরে মাত্র একবার ভোট হবে, যার ফলে শাসকদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হবে। সমালোচকদের আশঙ্কা, ডিলিমিটেশনের সময় যদি কোনো আবেগপ্রসূত জাতীয় ঘটনা (যেমন পুলওয়ামা বা বালাকোট) ঘটে, তবে সেই আবেগের তোড়ে রাজ্যের স্থানীয় ইস্যুগুলো ধামাচাপা পড়ে যাবে। উন্নয়নের প্রশ্ন তুললেই কপালে জুটবে ‘দেশবিরোধী’ তকমা।

২. ডিলিমিটেশন: গোবলয়ের ক্ষমতা বাড়িয়ে বাংলাকে অপ্রাসঙ্গিক করার ছক

দ্বিতীয় কৌশলটি হলো ডিলিমিটেশন বা লোকসভা আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ। লোকসভার আসন ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ করার যে পরিকল্পনা চলছে, তা মূলত উত্তর ভারত বা ‘হিন্দি বলয়’-এর রাজনৈতিক শক্তি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গ বা দক্ষিণ ভারতের মতো প্রগতিশীল রাজ্যগুলোর সংসদীয় গুরুত্ব কার্যত শূন্য হয়ে পড়বে। ‘মহিলা সংরক্ষণ বিল’-এর আড়ালে ডিলিমিটেশনের এই পথ প্রশস্ত করার চেষ্টা আসলে সংসদীয় পাটিগণিতে বাংলাকে মুছে দেওয়ার এক সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র।

৩. এসআইআর: ভোটার ছাঁটাইয়ের ‘অদৃশ্য’ হাতিয়ার

সবচেয়ে ভয়াবহ চাল হিসেবে দেখা হচ্ছে এসআইআর (SIR)-কে। অভিযোগ উঠছে, ভোটার তালিকা থেকে বেছে বেছে প্রান্তিক মানুষ, মহিলা ও সংখ্যালঘুদের নাম উধাও করে দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন একে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা যান্ত্রিক ত্রুটি বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলেও, বাস্তব পরিস্থিতি বলছে অন্য কথা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিজয়-রথ থামাতে ভোটার তালিকাকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে তৃণমূলের পক্ষ থেকে বারবার অভিযোগ তোলা হয়েছে। নিরপেক্ষতার মুখোশ পরে কমিশন আসলে মোদিবাহিনীর বুলি আওড়াচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও এখন জোরালো।

উন্নয়নের প্রচার ও বাঙালির আত্মসম্মান

বিজেপির ভিন রাজ্যের নেতারা বাংলায় এসে প্রচার করছেন যে রাজ্যের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। অথচ পরিযায়ী শ্রমিকের পরিসংখ্যানে উত্তরপ্রদেশ বা বিহারের তুলনায় বাংলা অনেক ভালো অবস্থানে। কেরল বা তামিলনাড়ুর মানুষ বিশ্বজুড়ে কাজ করতে গেলে যদি তাঁদের উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন না ওঠে, তবে বাঙালির ক্ষেত্রে কেন এই দ্বিচারিতা?

ইতিহাস সাক্ষী, বাঙালি ব্রিটিশদের কাছে মাথা নত করেনি। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়েও সাধারণ মানুষের স্পষ্ট বার্তা— উন্নয়নের নামে যদি বাঙালির আত্মসম্মান বিসর্জন দিতে হয়, তবে সেই ‘উন্নয়ন’ আদতে এক বড় রকমের আত্মসমর্পণ। আর বাঙালি অন্তত আত্মসমর্পণ করতে জানে না।

প্রতিবেদক: স্বাধীন মানব দাস।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *