কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ছোঁয়ায় বাঁচবে তরুণ প্রাণ, অবসাদ রুখতে যাদবপুরের অধ্যাপকের অভিনব অ্যাপ

ক্যাম্পাসের চনমনে, প্রাণবন্ত এক ছাত্র হঠাৎই বেছে নিয়েছিলেন আত্মহননের পথ। কেউ টেরই পায়নি তাঁর মনের ভেতরে জমে থাকা গভীর অন্ধকারের কথা। প্রিয় ছাত্রের এমন অকালমৃত্যু নাড়িয়ে দিয়েছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্সের অধ্যাপক দিগন্ত সাহাকে। সেই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-কে হাতিয়ার করে তিনি তৈরি করে ফেলেছেন এক যুগান্তকারী মোবাইল অ্যাপ— ‘আর্লি ডিটেকশন অফ মেন্টাল হেল্থ’। এর উদ্দেশ্য একটাই, তরুণ প্রজন্মের মনের অসুখ একেবারে প্রাথমিক স্তরেই ধরে ফেলা, যাতে আর কোনো প্রাণ অকালে ঝরে না যায়।
প্রযুক্তির মেলবন্ধনে মনের চিকিৎসা
অধ্যাপক দিগন্ত সাহার এই উদ্যোগে শামিল হয়েছেন আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মনোরোগ চিকিৎসক পায়েল তালুকদার এবং এমআর বাঙুর হাসপাতালের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সোনালী চট্টোপাধ্যায় সহ কয়েকজন পড়ুয়া। এই অ্যাপটি মূলত কৃত্রিম মেধার সাহায্যে ব্যবহারকারীর সঙ্গে কথোপকথন চালায়। অ্যাপে থাকা নির্দিষ্ট কিছু প্রশ্ন ও উত্তরের বিকল্প বেছে নেওয়ার মাধ্যমে প্রযুক্তিটি ব্যবহারকারীর মানসিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে। এরপর সেই বিশ্লেষণের ভিত্তিতে প্রাপ্ত নম্বর বা ডেটা সরাসরি পৌঁছে যায় সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের কাছে।
স্কোরিং পদ্ধতি ও সম্ভাব্য প্রভাব
অ্যাপের স্বয়ংক্রিয় এআই সিস্টেমটি ব্যবহারকারীর মানসিক সংকটকে কয়েকটি স্তরে ভাগ করে মূল্যায়ন করে। বিশ্লেষণে সমস্যার পরিমাণ ২০ শতাংশ হলে তাকে স্বাভাবিক ধরা হয়। তবে এই সূচক ৪০ শতাংশে পৌঁছালেই কাউন্সেলিংয়ের পরামর্শ দেওয়া হয়। সমস্যার তীব্রতা ৫০ শতাংশ পেরোলে প্রয়োজন হয় থেরাপির এবং তার বেশি হলে ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। ইতিমধ্যে একটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের কয়েকজন পড়ুয়ার মানসিক অবসাদ এই অ্যাপের মাধ্যমে চিহ্নিত করে মিউজিক থেরাপির সাহায্যে তাঁদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
বিজ্ঞান বলে, আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি হওয়ার আগে মানুষের আচরণে কিছু লক্ষণ প্রকাশ পায়। এই অ্যাপের মাধ্যমে সেই লক্ষণগুলো সময়মতো চিনে নিয়ে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া সম্ভব হবে। এর ফলে একদিকে যেমন মনোরোগের সামাজিক ট্যাবু ভেঙে শিক্ষার্থীরা সহজে নিজের মনের কথা প্রকাশ করতে পারবে, অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক ও শিক্ষাগত চাপের কারণে তরুণ প্রজন্মের আত্মহত্যার হারও অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।