আমেরিকার ৩০ মিলিয়নের ড্রোনকে টেক্কা দিচ্ছে ইরানের সস্তা ড্রোন! যুদ্ধের ময়দানে ওলটপালট সব সমীকরণ

আমেরিকার ৩০ মিলিয়নের ড্রোনকে টেক্কা দিচ্ছে ইরানের সস্তা ড্রোন! যুদ্ধের ময়দানে ওলটপালট সব সমীকরণ

আধুনিক যুদ্ধের সংজ্ঞাই বদলে দিচ্ছে ড্রোন প্রযুক্তি। আগে যুদ্ধের ময়দানে ট্যাঙ্ক কিংবা পদাতিক বাহিনীর যে দাপট ছিল, এখন তার জায়গা দখল করে নিচ্ছে আকাশপথের ড্রোন হামলা। সম্প্রতি ইরান-ইসরায়েল সংঘাতসহ বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন অস্থিরতায় ড্রোনের কার্যকারিতা এটিই প্রমাণ করেছে যে, আগামী দিনের যুদ্ধ হবে আকাশকেন্দ্রিক। যেখানে দামী যুদ্ধবিমানের চেয়েও অনেক সময় কার্যকর হয়ে উঠছে স্বয়ংক্রিয় বা দূর-নিয়ন্ত্রিত এই ড্রোনগুলো।

যুদ্ধক্ষেত্রে আধুনিক ড্রোনের কৌশলগত প্রভাব

প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের ফলে ড্রোন এখন কেবল নজরদারির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন নিখুঁত লক্ষ্যভেদে পারদর্শী এক মরণঘাতী হাতিয়ার। আধুনিক সমরবিদদের মতে, বড় কোনো দেশ বা শক্তির বিরুদ্ধে লড়তে কম খরচ এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রোন এখন গেম-চেঞ্জার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। নিচে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও আলোচিত ৫টি ড্রোনের কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করা হলো:

  • এমকিউ-৯ রিপার (MQ-9 Reaper): আমেরিকার তৈরি এই ড্রোনটিকে বিশ্বের অন্যতম সেরা মরণঘাতী অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের এই ড্রোনটি গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং নিখুঁত হামলার জন্য পরিচিত। তবে আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার সামনে এটি কিছুটা দুর্বল। ইরান-ইসরায়েল সংঘাত চলাকালীন আমেরিকা তাদের ৯টি এমকিউ-৯ ড্রোন হারিয়েছে, যা এই ড্রোনের সীমাবদ্ধতাও প্রকট করেছে। মূলত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের জন্য এটি সেরা হলেও শক্তিশালী দেশের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সামনে এটি বেশ নাজুক।
  • শাহেদ-১৩৬ (Shahed-136): ইরানের তৈরি এই ড্রোনটি সমরজগতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মাত্র ৩৫ হাজার ডলার বা প্রায় ৩২ লক্ষ টাকা মূল্যের এই ড্রোনটি আমেরিকার কোটি টাকার রিপার ড্রোনকে টেক্কা দিচ্ছে। এটি একটি আত্মঘাতী ড্রোন যা দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করে লক্ষ্যবস্তুর ওপর সরাসরি আছড়ে পড়ে। এর কম দাম এবং কার্যকারিতার কারণে এটি বর্তমানে যুদ্ধের অন্যতম শক্তিশালী উপাদানে পরিণত হয়েছে।
  • বায়রাক্তার টিবি২ (Bayraktar TB2): তুরস্কের তৈরি এই ড্রোনটি বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশেই জনপ্রিয়। বিশেষ করে যারা দামী পশ্চিমা ড্রোন কিনতে অক্ষম, তাদের জন্য এটি সেরা বিকল্প। সিরিয়া, লিবিয়া এবং ইউক্রেন যুদ্ধে এর অসাধারণ সাফল্য এটিকে বিশ্বসেরা ড্রোনের তালিকায় নিয়ে এসেছে।
  • হেরন টিপি (Heron TP): ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজ এটি তৈরি করেছে। প্রায় ৩০ ঘণ্টার বেশি সময় আকাশে ওড়ার ক্ষমতাসম্পন্ন এই ড্রোনটি ৪৫ হাজার ফুট উচ্চতায় থেকে ১০০০ কেজির বেশি সেন্সর ও অস্ত্র বহন করতে পারে। নজরদারি এবং কৌশলগত হামলার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য।
  • উইং লুং ২ (Wing Loong II): চীনের তৈরি এই ড্রোনটিকে আমেরিকার এমকিউ-৯ রিপারের সাশ্রয়ী বিকল্প বলা হয়। এশিয়া এবং আফ্রিকার দেশগুলোতে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে সরাসরি আক্রমণ—সবক্ষেত্রেই এটি বেশ কার্যকর।

প্রযুক্তির যুদ্ধে খরচের হিসাব

ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের উত্থান প্রমাণ করেছে যে, যুদ্ধের ময়দানে সবসময় দামী অস্ত্রই বিজয়ী হয় না। আমেরিকার ৩০ মিলিয়ন ডলারের একটি ড্রোনের তুলনায় ইরানের ৩৫ হাজার ডলারের ড্রোনটি অনেক ক্ষেত্রে বেশি ধ্বংসলীলা চালাতে সক্ষম। এই ‘লো-কস্ট হাই-ইমপ্যাক্ট’ কৌশলটি আধুনিক সমরনীতিতে বড় পরিবর্তন আনছে। ফলে বড় শক্তিগুলোও এখন তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছে।

একঝলকে

  • এমকিউ-৯ রিপার: আমেরিকার শক্তিশালী ড্রোন, যার একটির দাম ৩০ মিলিয়ন ডলারের বেশি।
  • শাহেদ-১৩৬: ইরানের তৈরি সস্তা কিন্তু অত্যন্ত ঘাতক আত্মঘাতী ড্রোন।
  • বায়রাক্তার টিবি২: তুরস্কের তৈরি ড্রোন যা বিভিন্ন সাম্প্রতিক যুদ্ধে সফল প্রমাণিত হয়েছে।
  • হেরন টিপি: ইসরায়েলের তৈরি কৌশলগত ড্রোন যা দীর্ঘ সময় আকাশে থাকতে সক্ষম।
  • উইং লুং ২: চিনের তৈরি ড্রোন যা মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় বেশ জনপ্রিয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *