এক দিনে ৯৬ বার ফোন! লোন অ্যাপের অত্যাচার না কি জাতিবিদ্বেষ? প্রাণ গেল মেধাবী ছাত্রের

এক দিনে ৯৬ বার ফোন! লোন অ্যাপের অত্যাচার না কি জাতিবিদ্বেষ? প্রাণ গেল মেধাবী ছাত্রের

কেরলের কান্নুর ডেন্টাল কলেজের ২২ বছর বয়সী দলিত ছাত্র নীতিন রাজ আর এল-এর মৃত্যু রাজ্যজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। গত শুক্রবার কলেজ ক্যাম্পাসের একটি ভবন থেকে পড়ে নীতিনের মৃত্যু হয়। তবে পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত এবং পারিপার্শ্বিক তথ্য বলছে, এই মৃত্যু কেবল একটি দুর্ঘটনা বা সাধারণ আত্মহত্যা নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে অনলাইন লোন অ্যাপের ভয়াবহ হেনস্তা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জেঁকে বসা জাতিগত বৈষম্যের এক করুণ আখ্যান।

লোন অ্যাপের ভয়ঙ্কর ফাঁদ

তদন্তে জানা গেছে, নীতিন গত ফেব্রুয়ারি মাসে একটি অনলাইন লোন অ্যাপ থেকে ১৩,৫০০ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। অ্যাপটি গুগল প্লে-স্টোর বহির্ভূত এবং সোশ্যাল মিডিয়া লিঙ্কের মাধ্যমে চালিত। এক মাসের মধ্যে সেই ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৯,০০০ টাকায়। নীতিন গত ৬ এপ্রিল ১,০০০ টাকা পরিশোধও করেছিলেন। কিন্তু ঋণের টাকা আদায়ের জন্য তাঁর ওপর অবর্ণনীয় মানসিক চাপ তৈরি করা হয়। মৃত্যুর আগের দিন লোন অ্যাপের পক্ষ থেকে নীতিনকে ৯৬ বার কল ও মেসেজ করে হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি নীতিনের ফোনের কন্টাক্ট লিস্ট হ্যাক করে তাঁর এক শিক্ষককেও ওই একই দিনে ২৬ বার ফোন করে হেনস্তা করা হয়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতিগত হেনস্তা

নীতিন তিরুবনন্তপুরমের এক অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের সন্তান ছিলেন। তাঁর বাবা দিনমজুর এবং মা মনরেগা প্রকল্পের কর্মী। অভিযোগ উঠেছে, কলেজের কয়েকজন শিক্ষক নীতিনের গায়ের রঙ, জাতি এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থা নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে তাঁকে কটূক্তি ও মানসিক নিগ্রহ করে আসছিলেন। লোন অ্যাপের পক্ষ থেকে তাঁর শিক্ষককে ফোন করার পর নীতিনকে প্রিন্সিপালের ঘরে তলব করা হয়। সেখান থেকে বেরিয়ে আসার মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যেই এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। পুলিশের ধারণা, দীর্ঘদিনের বৈষম্য এবং শিক্ষকের হেনস্তার গ্লানি সহ্য করতে না পেরেই তিনি এই চরম পথ বেছে নিয়েছেন।

প্রশাসন ও পুলিশের পদক্ষেপ

এই ঘটনায় পুলিশ আত্মহত্যার প্ররোচনা এবং এসসি/এসটি (SC/ST) নির্যাতন প্রতিরোধ আইনে মামলা দায়ের করেছে। কলেজের বিভাগীয় প্রধানসহ দুই শিক্ষককে এই মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। কেরল ইউনিভার্সিটি অফ হেলথ সায়েন্সেস-এর উপাচার্য ড. মোহনন কুন্নুমেল ৪ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন, যারা সরাসরি রাজ্যপালের কাছে রিপোর্ট জমা দেবেন।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদ

কেরলের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের জাতিগত বৈষম্যকে ‘ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ’ বলে বর্ণনা করেছেন। বিরোধী দল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে নীতিনের পরিবারকে ৫ লক্ষ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং তাঁদের একটি বাড়ি তৈরি করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ডেন্টাল কলেজের সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা অভিযুক্ত শিক্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।

একঝলকে

  • মৃতের নাম ও পরিচয়: নীতিন রাজ আর এল (২২), কান্নুর ডেন্টাল কলেজের দলিত ছাত্র।
  • ঋণের পরিমাণ: ১৩,৫০০ টাকা (লোন অ্যাপের দাবি ছিল ১৯,০০০ টাকা)।
  • হেনস্তার মাত্রা: মৃত্যুর আগের দিন ৯৬ বার কল করে লোন অ্যাপ থেকে হুমকি।
  • অভিযোগ: কলেজের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে জাতিগত বৈষম্য ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ।
  • আইনি ব্যবস্থা: দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে এসসি/এসটি আইনে মামলা ও বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে উচ্চতর তদন্ত কমিটি গঠন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *