শুভেন্দুর আপ্তসহায়ক খুনে ‘সুপারি কিলার’ ও ‘গ্লক’ পিস্তল ব্যবহারের সন্দেহ, ধাওয়ায় ছিল একাধিক বাইক!

শুভেন্দুর আপ্তসহায়ক খুনে ‘সুপারি কিলার’ ও ‘গ্লক’ পিস্তল ব্যবহারের সন্দেহ, ধাওয়ায় ছিল একাধিক বাইক!

শনিবার রাজ্যে বিজেপি সরকারের শপথগ্রহণের ঠিক ৫২ ঘণ্টা আগে বুধবার রাতে এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী থাকল মধ্যমগ্রাম। শুভেন্দু অধিকারীর অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং দীর্ঘদিনের আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথকে (৪২) দোহারিয়া এলাকায় পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে ঝাঁঝরা করে দিল দুষ্কৃতীরা। এই ঘটনায় কেবল প্রশাসনিক গাফিলতি নয়, বরং এক গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছে পুলিশ ও রাজনৈতিক মহল।

ফিল্মি কায়দায় ধাওয়া ও অতর্কিত হামলা

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বয়ান অনুযায়ী, ঘটনার ঘটনাক্রম ছিল রীতিমতো শিহরণ জাগানো:

  • টার্গেট ও ধাওয়া: চন্দ্রনাথবাবু কলকাতা থেকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বোর্ড লাগানো একটি সাদা স্করপিও গাড়িতে ফিরছিলেন। অভিযোগ উঠেছে, বেশ কিছুক্ষণ আগে থেকেই দুষ্কৃতীরা গাড়িটিকে ধাওয়া করছিল।
  • গাড়ি আটকে অপারেশন: চারটি মোটরবাইকে অন্তত আট জন দুষ্কৃতী ছিল। তাদের মাথায় হেলমেট এবং বাইকে কোনও নম্বর প্লেট ছিল না। অন্য একটি গাড়ি দিয়ে স্করপিওটির পথ আটকে দেওয়া হয়, যাতে চালক বুদ্ধদেব বেরা গাড়ি থামাতে বাধ্য হন।
  • পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি: গাড়ি থামতেই দুষ্কৃতীরা বাঁ দিক থেকে (যেদিকে চন্দ্রনাথবাবু বসেছিলেন) অতর্কিত গুলি চালাতে শুরু করে। প্রায় ৬ থেকে ১০ রাউন্ড গুলি চলে বলে প্রাথমিক অনুমান।
  • পিস্তলের ধরন: তদন্তকারীদের ধারণা, এই খুনে গ্লক ৪৭এক্স (Glock 47X) পিস্তল ব্যবহার করা হয়েছে। এটি অত্যন্ত উন্নত মানের আগ্নেয়াস্ত্র, যা সাধারণ দুষ্কৃতীদের হাতে থাকার কথা নয়। এর থেকেই অনুমান করা হচ্ছে, কোনও বড় মাথার নির্দেশে ‘সুপারি কিলার’ বা পেশাদার খুনি নিয়োগ করা হয়েছিল।

শুভেন্দুই কি আসল লক্ষ্য ছিলেন?

এই খুনের পর বড়সড় প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে— টার্গেট কি শুধুই চন্দ্রনাথ ছিলেন, নাকি লক্ষ্য ছিলেন খোদ শুভেন্দু অধিকারী? যেহেতু চন্দ্রনাথ যে গাড়িটি ব্যবহার করতেন সেটি বিধানসভার বোর্ড লাগানো এবং শুভেন্দু নিজেও অনেক সময় ওই ধরনের গাড়িতে যাতায়াত করেন, তাই তদন্তকারীদের একটি অংশ মনে করছে, শুভেন্দু ওই গাড়িতে থাকতে পারেন— এমন ভুল ধারণা থেকেই হয়তো বড় হামলাটি চালানো হয়েছিল।

রাজনৈতিক চাপানউতোর ও তদন্ত

  • বিজেপির অভিযোগ: শমীক ভট্টাচার্য সরাসরি তৃণমূলকে দায়ী করে বলেছেন, মাথায় গেরুয়া আবির লাগিয়ে তৃণমূলই এই তাণ্ডব চালাচ্ছে। প্রাক্তন বায়ুসেনা কর্মীকে খুনের মধ্য দিয়ে ভয়ের পরিবেশ তৈরির চেষ্টা হচ্ছে।
  • তৃণমূলের পাল্টা চাল: নজিরবিহীনভাবে তৃণমূল কংগ্রেস এই ঘটনায় আদালতের নজরদারিতে সিবিআই তদন্ত দাবি করেছে। তাদের দাবি, গণতন্ত্রে হিংসার স্থান নেই এবং দোষীদের কঠোর শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।
  • প্রশাসনের পদক্ষেপ: রাজ্য পুলিশের ভারপ্রাপ্ত ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তা জানিয়েছেন, যে গাড়িটি দিয়ে পথ আটকানো হয়েছিল সেটি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। তবে গাড়ির নম্বর প্লেটটি ভুয়ো ছিল।

চন্দ্রনাথ রথ: এক ছায়াসঙ্গীর বিদায়

রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের প্রাক্তনী চন্দ্রনাথ ২০০০ সালে মাধ্যমিক পাশ করে বায়ুসেনায় যোগ দিয়েছিলেন। সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর শুভেন্দু অধিকারীর আপ্তসহায়ক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ভবানীপুর উপনির্বাচন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচন— শুভেন্দুর প্রতিটি লড়াইয়ের নেপথ্যে অন্যতম কারিগর ছিলেন এই চন্দ্রনাথ। তাঁর মৃত্যুতে শুভেন্দু অধিকারী তাঁর এক অত্যন্ত বিশ্বস্ত সেনাপতিকে হারালেন।

বর্তমানে এলাকায় বিশাল পুলিশ বাহিনী ও কেন্দ্রীয় বাহিনী (CRPF) মোতায়েন রয়েছে। যশোর রোড অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন বিজেপি সমর্থকরা। শপথের আগে এই হাই-প্রোফাইল খুনের ঘটনায় রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন উঠে গেল।

প্রতিবেদক: বর্তমান ঠাকুর।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *