ধর্মস্থানে মাইকের আওয়াজ কমানো নিয়ে ধুন্ধুমার, ধৃত ২৬

শব্দদূষণ রোধে সরকারি নির্দেশিকা জারি হওয়ার পর তা কার্যকর করতে গিয়ে এবার রণক্ষেত্রের রূপ নিল আসানসোল। আসানসোল উত্তর থানার অন্তর্গত জাহাঙ্গির মহল্লা এলাকায় একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাইকের আওয়াজ কমানোর অনুরোধকে কেন্দ্র করে শুক্রবার রাতে এক চরম উত্তেজনা ও হিংসাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে উত্তেজিত জনতার রোষের মুখে পড়তে হয় পুলিশ প্রশাসনকে। পুলিশ আউটপোস্ট লক্ষ্য করে ব্যাপক পাথরবৃষ্টি এবং সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুরের ঘটনায় গোটা এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ কড়া অবস্থান নিয়ে রাতভর চিরুনি তল্লাশি চালিয়ে এখনও পর্যন্ত ২৬ জন উপদ্রবীকে গ্রেফতার করেছে।
অনুরোধ ঘিরে বচসা ও দুই গোষ্ঠীর সংঘাত
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজ্যজুড়ে অনুমোদিত শব্দসীমার বাইরে লাউডস্পিকার ব্যবহারের বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কঠোর নির্দেশিকার পরই আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের পক্ষ থেকে বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি চালানো হচ্ছিল। শুক্রবার রাতে আসানসোল উত্তর থানার পুলিশ জাহাঙ্গির মহল্লা এলাকার একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে গিয়ে সরকারি নিয়ম মেনে লাউডস্পিকারের ভলিউম বা আওয়াজ কিছুটা কমিয়ে রাখার অনুরোধ জানায়।
পুলিশ যখন কমিটির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলছিল, ঠিক তখনই এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেখানে উপস্থিত সাধারণ মানুষের মধ্যে আচমকা দুটি দল তৈরি হয়ে যায়। মাইকের আওয়াজ কমানো এবং আইন মানা নিয়ে দুই পক্ষ নিজেদের মধ্যে তুমুল বচসা ও হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায়।
পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা ও ভাঙচুর
মাঠের এই গোলমাল থামাতে এবং পরিস্থিতি শান্ত করতে যখন স্থানীয় আউটপোস্টের পুলিশ কর্মীরা এগিয়ে যান, তখনই উত্তেজিত জনতার একটি বড় অংশ পুলিশের ওপর চড়াও হয়।
- পাথরবৃষ্টি: পুলিশ ফাঁড়ি লক্ষ্য করে চারদিক থেকে অনবরত ইট ও পাথর ছুড়তে শুরু করে উন্মত্ত জনতা। পাথরবৃষ্টির জেরে ফাঁড়ির জানালার কাচ ও ভেতরের বেশ কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- যানবাহন ভাঙচুর: ফাঁড়ির বাইরে পার্ক করে রাখা একাধিক সরকারি পুলিশের গাড়ি, পুলিশ কর্মীদের মোটরবাইক এবং রাস্তায় থাকা সাধারণ অটোরিকশাও নির্মমভাবে ভাঙচুর করা হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং উন্মত্ত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশকে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসের (Tear Gas) সেল ফাটাতে হয়। পরবর্তীতে আসানসোল উত্তর থানা থেকে বিশাল পুলিশ বাহিনী ও কেন্দ্রীয় বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
রাতভর অ্যাকশনে পুলিশ, সিসিটিভি দেখে চিহ্নিতকরণ
এই ঘটনার পর আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের উচ্চপদস্থ কর্তারা পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। রাতেই গোটা জাহাঙ্গির মহল্লা ও সংলগ্ন রেলপাড় এলাকা পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া পাহারায় মুড়ে ফেলা হয়।
এলাকার সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ এবং মোবাইল ভিডিও খতিয়ে দেখে যারা সরাসরি পাথরবৃষ্টি ও ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়। এরপরই রাতভর পুলিশি অভিযানে বিভিন্ন ডেরা থেকে মোট ২৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতদের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারীদের কাজে বাধা দেওয়া, দাঙ্গা হাঙ্গামা ছড়ানো এবং সরকারি সম্পত্তি নষ্টের একাধিক জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। এলাকায় নতুন করে যাতে কোনো উত্তেজনা না ছড়ায়, তার জন্য পুলিশি টহল ও পকেটিং জারি রাখা হয়েছে।