যোগী রাজ্যে দুষ্কৃতী দমনে দিনে গড়ে ৫ অভিযান, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে খতম ২৮৯ অপরাধী

উত্তর প্রদেশে অপরাধীদের দমনে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহিষ্ণুতা নীতির এক বিস্তারিত খতিয়ান প্রকাশ করেছে সে রাজ্যের সরকার। ২০১৭ সালের মার্চ মাস থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত বিগত নয় বছরে অপরাধ দমনে রেকর্ড সংখ্যক অভিযান চালিয়েছে উত্তর প্রদেশ পুলিশ। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই দীর্ঘ সময়ে রাজ্যে মোট ১৭ হাজার ৪৩টি দুষ্কৃতী দমন অভিযান চালানো হয়েছে, যার গড় হিসাব করলে দাঁড়ায় দিনে প্রায় পাঁচটি করে অভিযান। এই লাগাতার পুলিশি অভিযানে ও দুষ্কৃতীদের সঙ্গে সংঘর্ষে এপর্যন্ত ২৮৯ জন কুখ্যাত অপরাধী নিহত হয়েছে এবং আহত হয়েছে ১১ হাজার ৮৩৪ জন। শুধুমাত্র চলতি ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসেই পুলিশের গুলিতে ২৩ জন দুষ্কৃতী খতম হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনেও উত্তর প্রদেশ পুলিশের এই অপরাধ দমন মডেল এবং ‘এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট’ হিসেবে পরিচিত ২০১১ ব্যাচের উত্তর প্রদেশ ক্যাডারের আইপিএস অফিসার অজয় পাল শর্মার ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক চর্চা হয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগণায় নির্বাচন কমিশনের বিশেষ পুলিশ পর্যবেক্ষক হিসেবে তাঁর উপস্থিতি বাংলায় রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। যোগী আদিত্যনাথ স্বয়ং বাংলায় নির্বাচনী প্রচারে এসে তাঁর সরকারের এই দুষ্কৃতী দমন অভিযানের সাফল্য বারে বারে তুলে ধরেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিগত ৯ বছরে এই সর্বাত্মক অভিযানের মাধ্যমে মোট ৩৪ হাজার ২৫৩ জন অপরাধীকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে। তবে এই অভিযানে ১৮ জন পুলিশ কর্মী কর্তব্যরত অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ৮৫২ জন পুলিশ সদস্য।
মিরাট ও বারাণসীতে সর্বাধিক এনকাউন্টার
সরকারি বিজ্ঞপ্তির তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, উত্তর প্রদেশের মধ্যে অপরাধ দমনে সবচেয়ে বেশি সক্রিয়তা লক্ষ্য করা গেছে মিরাট জোনে। রাজ্যের পশ্চিম প্রান্তের এই জোনে পুলিশ একাই ৪ হাজার ৮১৩টি অভিযান পরিচালনা করে ৮ হাজার ৯২১ জন অপরাধীকে গ্রেফতার করেছে। মিরাট পুলিশের দাবি, তাদের অভিযানে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ৯৭ জন কুখ্যাত অপরাধী ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছে এবং ৩ হাজার ৫১৩ জন আহত হয়েছে। এনকাউন্টার অভিযানের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সংসদীয় কেন্দ্র সংবলিত বারাণসী জোন। সেখানে মোট ১,২৯২টি এনকাউন্টারে ২৯ জন অপরাধী নিহত এবং ২,৪২৬ জন গ্রেফতার হয়েছে। এই তালিকায় তৃতীয় স্থানে থাকা আগ্রা জোনে ২,৪৯৪টি অভিযানে ২৪ জন দুষ্কৃতী নিহত ও ৫,৮৪৫ জন গ্রেফতার হয়েছে।
অভিযানের প্রভাব ও আইনি বিতর্ক
যোগী সরকারের এই কড়া পদক্ষেপের ফলে রাজ্যে অপরাধের গ্রাফ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং অপরাধীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে তীব্র আতঙ্ক। তবে এই বিশাল সংখ্যক এনকাউন্টার এবং বুলডোজার দিয়ে বেআইনি বাড়ি ভেঙে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে আইনি ও সাংবিধানিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে। নিহতের পরিবারের একাংশের অভিযোগ, এগুলো কোনো প্রকৃত সংঘর্ষ নয়, বরং পুলিশ হেফাজতে নিয়ে ঠান্ডা মাথায় খুন করছে। এই বিতর্ক গড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত এবং শীর্ষ আদালত কিছু নির্দিষ্ট অভিযান নিয়ে প্রশ্ন তুললেও যোগী সরকার তাদের নীতিতে অনড় রয়েছে। উত্তর প্রদেশ প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান যেমন সাধারণ মানুষের একাংশের কাছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে, তেমনই মানবাধিকার ও আইনি প্রক্রিয়ার লঙ্ঘনের প্রশ্নে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় স্তরে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।