আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্যের আড়ালে রক্তাক্ত পাকিস্তান, ঘরের মাঠে কোণঠাসা আসিম মুনির

আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্যের আড়ালে রক্তাক্ত পাকিস্তান, ঘরের মাঠে কোণঠাসা আসিম মুনির

পশ্চিম এশিয়ায় আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করে আন্তর্জাতিক স্তরে হঠাৎই গুরুত্ব বাড়িয়েছে পাকিস্তান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশংসা থেকে শুরু করে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি, কিংবা ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পর ভারতের বিরুদ্ধে নিজেদের সামরিক সাফল্যের প্রচার, সব মিলিয়ে ইসলামাবাদের কূটনৈতিক সুসময় চলছে বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এই চকচকে আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির আড়ালে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স ২০২৬ অনুযায়ী, ইতিহাসে প্রথম বার সন্ত্রাসবাদে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলির তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে পাকিস্তান। দেশের মাটিতে থাকা সন্ত্রাসবাদের বীজ উপড়ে ফেলতে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের নেতৃত্বাধীন পাক সেনাবাহিনী ডাহা ফেল করছে।

১৫ দিনে ৫টি বড় হামলা ও রক্তবন্যা

চলতি মে মাসেই মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে ৫টি বড় ধরনের জঙ্গিহামলায় কেঁপে উঠেছে পাকিস্তান, যেখানে প্রাণ হারিয়েছেন ৫০ জনেরও বেশি মানুষ। ৭ মে খাইবার পাখতুনখাওয়ার হাঙ্গু জেলায় মর্টার হামলায় দুই শিশুসহ ৬ জন নিহত হন। ১০ মে একটি চেকপয়েন্টে গাড়ি বোমা বিস্ফোরণ ও গুলিতে ১৫ জন নিহত হন। এর ঠিক দু’দিন পর ১২ মে আত্মঘাতী হামলায় প্রাণ হারান আরও ৯ জন। ১৪ মে বালোচিস্তানে আধাসামরিক বাহিনীর ওপর হামলায় ৫ সেনা ও ৭ জঙ্গি নিহত হয়। সর্বশেষ ১৫ মে উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানে বিস্ফোরকবোঝাই ট্রাক নিয়ে নিরাপত্তা চৌকিতে আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে ৯ আধাসামরিক সেনাকে খতম করে জঙ্গিরা। তিন দিন আগেই খাইবার পাখতুনখাওয়ায় সেনাচৌকিতে আত্মঘাতী হামলায় ১৫ পাক সেনার মৃত্যু হয়েছে।

বিদ্রোহীদের দুঃসাহস ও সেনার ব্যর্থতা

পাকিস্তানের এই রক্তাক্ত পরিস্থিতির নেপথ্যে রয়েছে খাইবার পাখতুনখাওয়ার জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী ও বন্দুকধারীরা প্রায় বিনা বাধায় সেনা চৌকি, পুলিশ কনভয় এবং সামরিক প্রশিক্ষণ কলেজে হামলা চালাচ্ছে। এমনকি যখন সৌদি আরবকে রক্ষা করার জন্য পাকিস্তানি সৈন্যদের আকাশপথে পাঠানো হচ্ছিল, ঠিক তখনই টিটিপি জঙ্গিরা পাকিস্তানি সামরিক চৌকিগুলি দখল করে সৈন্যদের নৃশংসভাবে হত্যা করে। বালোচ বিদ্রোহীরা গোয়াডরের কাছে কোস্ট গার্ড টহল দলের ওপর হামলা চালিয়ে তিন কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে, যা কোনো পাকিস্তানি সামুদ্রিক জাহাজে বিএলএ-র হামলার প্রথম ঘটনা। ভৌগোলিক বিশালতার কারণে বালোচিস্তান নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে পাক সেনাবাহিনী নিজেদের ‘শারীরিক প্রতিবন্ধকতা’র কথা স্বীকার করে নিয়েছেন খোদ প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফ।

ঘটনার কারণ ও সম্ভাব্য প্রভাব

কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চরম বিপর্যয়ের মূল কারণ পাকিস্তানের ভুল রণকৌশল। ইসলামাবাদ যখন নিজেদের আন্তর্জাতিক মঞ্চে বড় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে জাহির করতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই দেশের ভেতরের উগ্রপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি এই কৌশলগত শূন্যতার পূর্ণ সুযোগ নিয়েছে। ইরান সীমান্তের কাছাকাছি নিরাপত্তা জোরদার করতে গিয়ে সেনাবাহিনীকে অতিরিক্ত চাপ নিতে হচ্ছে, যার ফলে দেশের অন্যান্য অংশে আইনশৃঙ্খলা ও নজরদারি শিথিল হয়ে পড়েছে। এই আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী ও জঙ্গিগোষ্ঠীগুলি তাদের নেটওয়ার্ক পুনর্গঠন করে আরও পরিশীলিত ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। দেশের ভেতরে টিটিপি বা বালোচ বিদ্রোহীদের হামলা এবং চরম অর্থনৈতিক সংকট ঘনীভূত হতে থাকায় পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির গ্যাসবেলুন দ্রুত ফুটো হতে শুরু করেছে, যা আগামী দিনে দেশটিকে আরও গভীর অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *