পুর নিয়োগ দুর্নীতিতে সুজিত-পাঁচুকে মুখোমুখি বসিয়ে ৯ ঘণ্টার ম্যারাথন জেরা, এবার রথীনকে ডাকার প্রস্তুতি?

পুর নিয়োগ দুর্নীতিতে সুজিত-পাঁচুকে মুখোমুখি বসিয়ে ৯ ঘণ্টার ম্যারাথন জেরা, এবার রথীনকে ডাকার প্রস্তুতি?

রাজ্যে পুরসভা নিয়োগ দুর্নীতি মামলার তদন্তে ধৃত রাজ্যের প্রাক্তন দমকল মন্ত্রী তথা তৃণমূল নেতা সুজিত বসু এবং দক্ষিণ দমদম পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান পাঁচু রায়কে মুখোমুখি বসিয়ে এক বিস্ফোরক জেরা সারল এনফোর্সেনমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED)। সোমবার সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে (CGO Complex) কেন্দ্রীয় এজেন্সির গোয়েন্দারা এই দুই প্রভাবশালীকে সামনাসামনি বসিয়ে প্রায় ৯ ঘণ্টা ধরে ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ চালান। ইডি সূত্রে খবর, এই মুখোমুখি জেরার পর্বে একের পর এক এমন কিছু নথিপত্র ও তথ্য সামনে এসেছে, যা এই কোটি কোটি টাকার নিয়োগ কেলেঙ্কারির অন্তিম শিকড়কে আমজনতার সামনে টেনে আনতে চলেছে।

সাদা কাগজে সই করিয়ে জালিয়াতি, ওড়ানো হলো ২৪ জনের প্যানেল

ইডি-র তদন্তকারী আধিকারিকদের দাবি, দক্ষিণ দমদম পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান পদে যখন সুজিত বসু আসীন ছিলেন এবং চেয়ারম্যানের চেয়ারে ছিলেন পাঁচু রায়, ঠিক সেই সময়েই পুরসভার নিয়োগে সবথেকে বড় জালিয়াতিটি করা হয়েছিল। সোমবারের জেরায় মূলত দুটি বিষয়ের ওপর সবথেকে বেশি জোর দেন গোয়েন্দারা:

  • সাদা কাগজে সই: তৎকালীন সময়ে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে এবং ইন্টারভিউ বোর্ডের সদস্যদের কাছ থেকে কীভাবে ফাঁকা বা সাদা কাগজে আগে থেকে সই করিয়ে রাখা হয়েছিল, সেই রহস্যের জট খোলার চেষ্টা করা হয়।
  • সুপারিশের জাদুতে নামবদল: তদন্তে জানা গিয়েছে, পুরসভায় নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্যানেলভুক্ত হওয়া যোগ্য ২৪ জন প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে সম্পূর্ণ গায়ের জোরে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই জায়গায় তৎকালীন চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানের প্যাডে সুপারিশ করা ২৯ জন ‘অযোগ্য’ প্রার্থীর নাম অবৈধভাবে তালিকায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।

এই জালিয়াতির খতিয়ান ও সম্পূর্ণ সুপারিশপত্রটি ‘ডিরেক্টরেট অব লোকাল বডিজ’ (DLB)-এর তৎকালীন ডিরেক্টর জ্যোতিষ্মান চট্টোপাধ্যায়ের কাছে পাঠানো হয়েছিল। পাঁচু রায়ের বাড়িতে চালানো আগের তল্লাশিতে উদ্ধার হওয়া সেই সমস্ত আসল সুপারিশপত্র ও ডায়েরি দু’জনের সামনে রেখেই সোমবার দিনভর বয়ান মেলানোর কাজ করেন তদন্তকারীরা।

এবার সুজিতের মুখোমুখি বসানো হতে পারে রথীন ঘোষকেও!

আদালতের নির্দেশে আগামী ২১ মে পর্যন্ত ইডি হেফাজতে রয়েছেন প্রাক্তন মন্ত্রী সুজিত বসু। কেন্দ্রীয় এজেন্সি সূত্রে জানা গিয়েছে, সুজিতকে লক-আপে রেখে জেরা করার পর প্রতিদিন নিত্যনতুন প্রভাবশালীদের নাম এবং টাকার লেনদেনের খতিয়ান উঠে আসছে। এই মামলার সূত্র ধরেই উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রাম পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান তথা রাজ্যের আরেক প্রাক্তন খাদ্যমন্ত্রী রথীন ঘোষকেও এর আগে দীর্ঘক্ষণ জেরা করেছিল ইডি।

বর্তমানে সুজিত বসুর বয়ানে রথীন ঘোষের যোগসূত্র মেলায়, তদন্তের পরবর্তী ধাপে সুজিত বসুর মুখোমুখি বসিয়ে রথীন ঘোষকেও সিজিও কমপ্লেক্সে জেরা করার জোরালো প্রস্তুতি নিচ্ছেন ইডির দুঁদে আধিকারিকেরা।

ফলতার আবহে নবান্নের জিরো টলারেন্স বার্তা

এদিকে, পুর নিয়োগ দুর্নীতির এই হাই-প্রোফাইল অ্যাকশনের মাঝেই আজ মঙ্গলবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের পুনর্নির্বাচনের মেগা প্রচারে ঝড় তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের মতে, নতুন সরকারের মন্ত্রিসভা গঠিত হওয়ার পর যেভাবে নিয়োগ দুর্নীতি ও কাটমানি সিন্ডিকেটের একের পর এক পুরোনো ফাইল খোলা হচ্ছে, তাতে সুজিত বসু বা রথীন ঘোষের মতো বিগত জমানার হেভিওয়েটদের আইনি জট যে আরও কয়েক গুণ বাড়ল, তা বলাই বাহুল্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *