১৬ মাসে দেড় লাখের নতুন অনুপ্রবেশ, বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকট আরও তীব্র

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীর অনুপ্রবেশ কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না, যার ফলে সামগ্রিক সংকট এখন আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সহিংসতা ও সেনা অভিযানের মুখে টিকতে না পেরে গত ১৬ মাসে নতুন করে আরও প্রায় দেড় লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ মাসের শেষ পর্যন্ত প্রায় ১ লক্ষ ৪৯ হাজার ৭৬৯ জন নতুন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে নিবন্ধিত হয়েছে। বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংকটের গভীরতা ও স্থানীয় প্রভাব
নতুন এই অনুপ্রবেশের ফলে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ অঞ্চলের ওপর চাপ চরম আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে সব মিলিয়ে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গার মোট সংখ্যা প্রায় ১৫ লক্ষ ছুঁয়ে গেছে। মাত্র ২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় এই বিপুল সংখ্যক মানুষের বসবাসের কারণে কক্সবাজারের এই অঞ্চলটি বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী এলাকায় পরিণত হয়েছে। স্থানীয় উখিয়া ও টেকনাফে মূল অধিবাসীর সংখ্যা যেখানে মাত্র ৫ লক্ষ, সেখানে তার দ্বিগুণ সংখ্যক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে রয়েছে। বিপুল এই জনগোষ্ঠীর বাড়তি চাপ সামলাতে গিয়ে স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর তীব্র নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও সামাজিক অবক্ষয়
অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপের পাশাপাশি রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। ক্যাম্পে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায় প্রতিদিনই সশস্ত্র সংঘাত ও খুনাখুনির মতো ঘটনা ঘটছে। এর পাশাপাশি এক শ্রেণির অপরাধী চক্রের প্ররোচনায় সামাজিক অবক্ষয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, বাড়তি আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে রোহিঙ্গা যুবতী ও তরুণীদের কক্সবাজার এবং চট্টগ্রামের বিভিন্ন হোটেলগুলোতে অনৈতিক কাজে লিপ্ত করা হচ্ছে। এমনকি সমুদ্রপথে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে মানব পাচারের শিকার হচ্ছে এই শরণার্থী তরুণীরা।
উচ্চ জন্মহার ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
নতুন অনুপ্রবেশের পাশাপাশি রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে উচ্চ জন্মহার সংকটকে আরও দীর্ঘমেয়াদী ও জটিল করে তুলছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ক্যাম্পগুলোতে প্রতিদিন গড়ে শতাধিক শিশুর জন্ম হচ্ছে, যার ফলে বছরে প্রায় ৩০ হাজার নতুন শিশু যুক্ত হচ্ছে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর সাথে। একদিকে মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনিশ্চিত, অন্যদিকে প্রতিদিন বাড়তে থাকা জনসংখ্যা ও নতুন অনুপ্রবেশের কারণে বাংলাদেশ এখন এক চরম মানবিক ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।