ওজেম্পিক বা ওয়েগোভির ম্যাজিক কি সত্যিই শেষ, জেনে নিন ওজন থমকে যাওয়ার আসল বিজ্ঞান

ওজন কমানোর আধুনিক দুনিয়ায় এখন সবচেয়ে আলোচিত দুটি নাম হলো ‘ওজেম্পিক’ এবং ‘ওয়েগোভি’। মূলত টাইপ-২ ডায়াবেটিসের চিকিৎসার জন্য তৈরি সেমাগ্লুটাইড গোত্রের এই ওষুধগুলো বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মেদ কমানোর এক জাদুকরি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। হলিউড তারকা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—দ্রুত ওজন ঝরাতে অনেকেই এই ইঞ্জেকশনগুলোর ওপর ভরসা রাখছেন। তবে সাম্প্রতিক একটি গবেষণা বলছে, এই ওষুধের কার্যকারিতা চিরস্থায়ী নয় এবং একটি নির্দিষ্ট সময় পর ওজন কমার গতি পুরোপুরি থমকে যেতে পারে, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে ‘ওজন কমার প্লেটো’ বলা হয়।
‘নেচার মেটাবলিজম’ জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, ওজেম্পিক বা ওয়েগোভি মানবদেহের ‘GLP-1’ নামক হরমোনের মতো আচরণ করে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করে এবং পাকস্থলী খালি হওয়ার প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়। ফলে মস্তিষ্কের ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী কোষগুলোর কারণে সারাক্ষণ পেট ভরা থাকার অনুভূতি তৈরি হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন একটানা ওষুধ ব্যবহারের ফলে মস্তিষ্কের ওই নির্দিষ্ট কোষগুলো ওষুধটির প্রতি এক ধরনের প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং নিজেদের ভেতরের রিসেপ্টর বা সংগ্রাহকগুলোকে গুটিয়ে নেয়। যখন মস্তিষ্কের কোষগুলো ওষুধের সংকেতে আর সাড়া দেয় না, তখন পুরোনো ক্ষুধা আবার চাঙ্গা হয়ে ওঠে এবং ওজন কমা এক জায়গায় এসে আটকে যায়।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও সম্ভাব্য প্রভাব
গবেষকেরা ওজেম্পিক বা ওয়েগোভির মতো ওষুধের কিছু সীমাবদ্ধতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। চর্বি কমার পাশাপাশি শরীর থেকে জরুরি পেশি বা মাসল মাস কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এছাড়া ওষুধ ছেড়ে দিলে বা এর কার্যকারিতা কমে গেলে ওজন আবারও আগের জায়গায় ফিরে আসার মতো ‘রিবাউন্ড এফেক্ট’ ঘটতে পারে। পাশাপাশি বমি বমি ভাব, বমি হওয়া কিংবা হজমের গোলমালের মতো পেটের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
বাধা কাটানোর উপায় ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান
বিজ্ঞানীরা এই প্লেটো বা স্থবিরতা ভাঙার উপায় নিয়ে কাজ করছেন। আপাতত জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন এনে এই বাধা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে চিকিৎসকেরা মনে করেন। এর জন্য প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অতিরিক্ত চিনি বাদ দিয়ে পাতে তাজা ফলমূল, শাকসবজি এবং চর্বিহীন প্রোটিন ও ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার রাখতে হবে। কার্ডিও ব্যায়ামের পাশাপাশি স্ট্রেন্থ ট্রেনিং বা ওজন তোলার ব্যায়াম করা উচিত, যা পেশি ধরে রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া দৈনিক ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ওষুধের ডোজের মাত্রা পরিবর্তন করা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ উপায়ে ওজন কমানোর আসল চাবিকাঠি হলো ধৈর্য। প্রতি সপ্তাহে ০.২৫ থেকে ১ কেজি পর্যন্ত ওজন কমানোকে আদর্শ বলে মনে করা হয়, যা শরীরের মেটাবলিজম ঠিক রাখে এবং জরুরি পেশি নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করে।