শিল্পী মহলে বাড়ছে ক্ষোভ, ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে গড়িয়াহাট থানায় বিস্ফোরক অভিযোগ ইভেন্ট ম্যানেজারের

পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি জগতের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু রবীন্দ্রসদনকে কেন্দ্র করে এবার গুরুতর অভিযোগ উঠল সাবেক সরকারের অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব তথা সংগীতশিল্পী ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে। জনপ্রিয় ইভেন্ট ম্যানেজার তোচন ঘোষ তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বজনপোষণের বিস্ফোরক অভিযোগ এনেছেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কলকাতার গড়িয়াহাট থানায় একটি লিখিত অভিযোগও দায়ের করা হয়েছে, যা রাজ্যের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মহলে নতুন করে শোরগোল ফেলে দিয়েছে।
ইন্দ্রনীলের ইশারায় চলত রবীন্দ্রসদন
অভিযোগের মূল তীর রবীন্দ্রসদনের সরকারি অনুষ্ঠান এবং হল বণ্টনের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের দিকে। তোচন ঘোষের দাবি, রবীন্দ্রসদনের যাবতীয় কাজকর্ম সাবেক সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ইন্দ্রনীল সেনের ‘আঙুলের ইশারাতেই’ পরিচালিত হতো। হল পাওয়া বা না পাওয়া সম্পূর্ণভাবে তাঁর মর্জির ওপর নির্ভর করত। প্রতিদিন বিকেলে নিজের অনুগামীদের নিয়ে রবীন্দ্রসদনের বাইরে বসে তিনি এই পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে অভিযোগ। এর ফলে অনেক যোগ্য এবং গুণী শিল্পী রবীন্দ্রসদনে অনুষ্ঠান করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং কেবল তাঁর ঘনিষ্ঠ বৃত্তের মানুষেরাই সেখানে অগ্রাধিকার পেয়েছেন।
চাপ দিয়ে গান গাওয়ানোর বিস্ফোরক দাবি
হল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অভিযোগটি উঠেছে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা গান গাইতে শিল্পীদের বাধ্য করার বিষয়ে। তোচন ঘোষের দাবি অনুযায়ী, ইন্দ্রনীল সেন নিজের ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে অন্যান্য বিশিষ্ট শিল্পীদের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করতেন যাতে তাঁরা সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর লেখা এবং তাঁর নিজের সুরে তৈরি গানে কণ্ঠ দেন। এই প্রসঙ্গে তিনি প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী শ্রীরাধা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি পুরোনো কথোপকথনের সূত্র টেনে জানান যে, প্রবল চাপের মুখে পড়েই অনেক বড় শিল্পী এই গানগুলো গাইতে বাধ্য হয়েছিলেন। যদিও এই বিষয়ে শ্রীরাধা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি তোচন ঘোষের দাবির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং রাজনৈতিক রঙের ঊর্ধ্বে উঠে নিজের ৪০ বছরের সংগীত সাধনা ও যোগ্যতার জোরেই সব সরকারের আমলে গান গেয়েছেন বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন।
সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর প্রভাবের আশঙ্কা
শিল্পী ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর তোচন ঘোষের এই থানা পুলিশ পর্যন্ত গড়ানো অভিযোগের জেরে কলকাতার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক ধরনের অস্বস্তি ও ক্ষোভের আবহ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সরকারি পরিকাঠামো ব্যবহার করে স্বজনপোষণ এবং শিল্পীদের ওপর রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব খাটানোর এই সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে মুক্ত শিল্পচর্চার পরিবেশকে কলুষিত করে। ক্ষমতার অপব্যবহারের এই অভিযোগগুলো যদি তদন্তে সত্যি প্রমাণিত হয়, তবে তা রাজ্যের সংস্কৃতি দপ্তরের স্বচ্ছতা এবং সরকারি হল ব্যবস্থাপনার নিরপেক্ষতাকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাবে। একই সাথে শিল্পীদের সৃজনশীল স্বাধীনতার ওপর এই ধরনের চাপ ভবিষ্যতে আরও অনেক অবদমিত ক্ষোভকে সামনে এনে সংস্কৃতি জগতের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ বদলে দিতে পারে।