মমতা এক বছর আটকে রাখলেও এবার বাংলায় শুরু হচ্ছে ঐতিহাসিক ডিজিটাল জনগণনা

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে পশ্চিমবঙ্গে শুরু হতে চলেছে বহুল চর্চিত জনগণনা প্রক্রিয়া। ভারতের ইতিহাসে প্রথমবার সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে এই জনগণনা সম্পন্ন হবে। শুক্রবার নবান্নে এক হাইপ্রোফাইল সাংবাদিক বৈঠকে রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই মেগা প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেন। আগামী ১ অগস্ট থেকে রাজ্যে এই প্রক্রিয়া শুরু হবে, যা চলবে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ পর্যন্ত। তবে এই ঐতিহাসিক ঘোষণা করতে গিয়েই রাজ্যের পূর্বতন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে তীব্র নিশানা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
এক বছর ফাইল আটকে রাখার অভিযোগ
দেশজুড়ে ২০১১ সালের পর এই প্রথম নতুন করে জনগণনা হতে চলেছে। নবান্ন সূত্রে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় সরকার গত বছরের জুন মাসেই এই সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল। অন্যান্য রাজ্যে কাজ এগোলেও বাংলায় তা থমকে ছিল। এই প্রসঙ্গে পূর্বতন সরকারকে আক্রমণ করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, বিগত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার রাজনৈতিক কারণে জনগণনার চিঠির কোনো উত্তর দেয়নি এবং ফাইল আটকে রেখেছিল। তৎকালীন মুখ্যসচিবও রাজনৈতিক নির্দেশের অপেক্ষায় বসেছিলেন। অবশেষে বর্তমান রাজ্যপালের সায় মেলার পর গত ১১ মে রাজ্যে এই বিজ্ঞপ্তি জারি করা সম্ভব হয়েছে। কম সময়ের মধ্যে এই বিশাল কাজ সম্পন্ন করা এখন নতুন সরকারের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
ডিজিটাল রূপরেখা ও দুই দফার প্রক্রিয়া
সেন্সাস অপারেশনের ডিরেক্টর রেশমি কমল জানিয়েছেন, এবারের জনগণনা হবে সম্পূর্ণ আধুনিক ও ডিজিটাল প্রযুক্তিতে। মূল প্রক্রিয়াটি দুটি দফায় বিভক্ত করা হয়েছে। প্রথম দফায় হবে ‘হাউসলিস্টিং এবং হাউজিং সেন্সাস অপারেশন’ (HLO) এবং দ্বিতীয় দফায় হবে ‘পপুলেশন এন্যুমেরাশন’ (PE)।
এবারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো ‘সেল্ফ এন্যুমেরাশন’ বা স্ব-নথিবদ্ধকরণের সুযোগ। ১ অগস্ট থেকে ১৫ অগস্ট পর্যন্ত নাগরিকরা নিজেরাই ডিজিটাল মাধ্যমে নিজেদের তথ্য নথিভুক্ত করতে পারবেন। যারা এই সময়ের মধ্যে নিজেদের তথ্য দেবেন না, আগামী ১৬ অগস্ট থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তথ্য সংগ্রাহকরা সরাসরি তাদের বাড়ি বাড়ি যাবেন। এই দফায় পরিবারের আর্থিক অবস্থা ও সম্পত্তি সংক্রান্ত মোট ৩৩টি প্রশ্নের উত্তর সংগ্রহ করা হবে। দ্বিতীয় দফার পূর্ণাঙ্গ সূচি পরবর্তীকালে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হবে।
সীমান্তবর্তী ডেমোগ্রাফি ও সম্ভাব্য প্রভাব
পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই জনগণনা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সঠিক তথ্য সামনে এলে রাজ্যের প্রকৃত জনসংখ্যা এবং আর্থ-সামাজিক পরিকাঠামোর আসল চিত্রটি স্পষ্ট হবে, যা ভবিষ্যৎ সরকারি উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা তৈরিতে সাহায্য করবে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজেই এই জনগণনার দূরগামী প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে রাজ্যের প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যার অনেকটা অংশই কাঁটাতারহীন। পূর্বতন সরকারের নীতিগত কিছু সিদ্ধান্তের কারণে রাজ্যের সীমান্ত এলাকার ডেমোগ্রাফি বা জনসংখ্যার ভারসাম্যে বড় বদল এসেছে। বর্তমানে সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশকারীদের একাংশের ফিরে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। যেহেতু ডিজিটাল জনগণনায় নিখুঁত তথ্য ও প্রমাণ যাচাই করা হবে, তাই অনুপ্রবেশকারীরা প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে পারবে না। ফলে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজ্যের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের সঠিক পরিসংখ্যান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। নতুন সরকারের এই মেগা পদক্ষেপ আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতি ও প্রশাসনে বড়সড় প্রভাব ফেলতে চলেছে।