হরমুজ প্রণালীর মহাসঙ্কটেও ভারতের মাস্টারস্ট্রোক, যে কোনো দেশের কাঁচা তেল থেকেই বিপুল মুনাফা তোলার মহাপ্রস্তুতি

হরমুজ প্রণালীর মহাসঙ্কটেও ভারতের মাস্টারস্ট্রোক, যে কোনো দেশের কাঁচা তেল থেকেই বিপুল মুনাফা তোলার মহাপ্রস্তুতি

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে উত্তাপ। হোর্মুজ প্রণালী ঘিরে তৈরি হওয়া সাম্প্রতিক যুদ্ধকালীন সঙ্কট ও আন্তর্জাতিক শিপিং মহলের চরম অচলাবস্থা বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারকে ওলটপালট করে দিয়েছে। তবে এই মহাসঙ্কটকেও কার্যত নিজেদের অনুকূলে ঘুরিয়ে পরম সুযোগে বদলে ফেলছে ভারত। সৌজন্যে, দেশের তেল শোধনাগার বা রিফাইনারিগুলির অবিশ্বাস্য প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণ। বর্তমানে ভারতীয় রিফাইনারিগুলি বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের এবং যে কোনো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েল প্রসেস করার এক নজিরবিহীন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করেছে। ফলে জোগান থমকে যাওয়ার ভয় দূরে সরিয়ে এক বড়সড় অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক জয় হাসিল করছে নয়াদিল্লি।

বদলে যাওয়া বাজারে ভারতের ‘অ্যানি ক্রুড স্ট্র্যাটেজি’

আগে ভারতীয় রিফাইনারিগুলি মূলত পারস্য উপসাগরীয় বা খাড়ি দেশগুলির নির্দিষ্ট কিছু গ্রেডের অপরিশোধিত তেলের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু যুদ্ধ ও শিপিং ব্যবস্থার গোলমালের কারণে বাজারে এখন শুধু তেলের পরিমাণই কমেনি, বরং তেলের ধরনও বদলে গিয়েছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে ভারতের তেল সংস্থাগুলি এখন ‘অ্যানি ক্রুড স্ট্র্যাটেজি’ বা ‘যে কোনো ক্রুড নীতি’ নিয়ে ময়দানে নেমেছে। হালকা, ভারী, মিষ্টি কিংবা টক— সব ধরনের ক্রুড অয়েল প্রসেস করার জন্য নিজেদের ইউনিটগুলিকে নিমেষে অ্যাডজাস্ট করে নিচ্ছে ভারতীয় শোধনাগারগুলি। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, তেল আমদানির জন্য ভারতকে আর কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলের ওপর চাতক পাখির মতো চেয়ে বসে থাকতে হচ্ছে না।

সস্তার রুশ তেল এবং চিনের পিছু হটা

ইরান যুদ্ধের আবহে রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কড়াকড়ি কিছুটা শিথিল হতেই ভারত রুশ তেল আমদানির গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, চলতি ২০২৬ সালের মে মাসেই ভারতের রুশ তেল আমদানির পরিমাণ প্রতিদিন প্রায় ২.১৭ মিলিয়ন ব্যারেলে পৌঁছে গিয়েছে, যা এ যাবৎকালের এক সর্বকালীন রেকর্ড। ঠিক এই সময়েই চিন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল আমদানি একধাক্কায় অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। ড্রাগন পিছু হটতেই বিশ্ববাজারে থাকা বেশ কিছু বড় তেলের কার্গো অনেক সস্তায় এবং সুবিধাজনক শর্তে ভারতের ঝুলিতে চলে আসছে।

প্রযুক্তির জোরে বিপুল মুনাফা ও শক্তি সুরক্ষা

ভারতের আধুনিক শোধনাগারগুলি আজ পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল ও উন্নতমানের রিফাইনিং পরিকাঠামোর অন্তর্ভুক্ত। আন্তর্জাতিক সঙ্কটের সময়ে বিশ্বের বহু দেশের রিফাইনারি শুধু নির্দিষ্ট কিছু গ্রেডের তেলই শোধন করতে পারে, যা তাদের হাত-পা বেঁধে দেয়। কিন্তু ভারত এখানে ব্যতিক্রম। ভারতীয় রিফাইনারিগুলি বাজার থেকে সবচেয়ে সস্তা ও নিম্নমানের ভারী ক্রুড কিনেও তা থেকে পেট্রোল, ডিজেল এবং এভিয়েশন টারবাইন ফুয়েলের মতো উচ্চ মূল্যের জ্বালানি তৈরি করে ফেলছে। এই সস্তা ক্রুড কিনে দামি জ্বালানি বিক্রি করার কৌশলই ভারতীয় তেল সংস্থাগুলির লাভের মার্জিন বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। হরমুজ প্রণালীর পারাপার ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় ভারত ইতিমধ্যেই আফ্রিকা, রাশিয়া ও লাতিন আমেরিকার মতো বিকল্প উৎস থেকে তেল আনা শুরু করেছে। দেশের বাজারে পেট্রোল-ডিজেলের জোগান স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ মজুত রেখে দেশের অর্থনীতিকে বড়সড় ধাক্কা থেকে বাঁচিয়ে চলেছে নয়াদিল্লি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *