একদিনে ৩ হাজার পার, ভারতে তাপপ্রবাহে মৃত্যুর ভয়াবহ পরিসংখ্যান ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য!

একদিনে ৩ হাজার পার, ভারতে তাপপ্রবাহে মৃত্যুর ভয়াবহ পরিসংখ্যান ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য!

চলতি বছরে গ্রীষ্মের শুরুতেই দেশজুড়ে রুদ্ররূপ ধারণ করেছে সূর্য। ভারতের একাধিক প্রান্তে তাপমাত্রার পারদ ইতিমধ্যেই ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের গণ্ডি পার করে ফেলেছে। প্রতি বছরই তীব্র দাবদাহ ও চরম আবহাওয়ার প্রকোপ যেভাবে ক্রমশ বাড়ছে, তা এখন একপ্রকার সাধারণ ঘটনা মনে হলেও আবহাওয়া বিজ্ঞানী ও গবেষকদের মতে এই মারাত্মক পরিস্থিতি কোনওভাবেই স্বাভাবিক নয়। তীব্র গরম ও তাপপ্রবাহ মানুষের শরীরের জন্য ঠিক কতটা প্রাণঘাতী, তা এক চাঞ্চল্যকর গবেষণায় তুলে ধরেছেন বিশেষজ্ঞরা। ভারতের ১০টি বড় শহরের অতীতের আবহাওয়া ও মৃত্যুর খতিয়ান বিশ্লেষণ করে এই সমীক্ষাটি চালানো হয়েছে।

গবেষকদের সেই সমীক্ষায় যে পরিসংখ্যান উঠে এসেছে, তা এককথায় শিউরে ওঠার মতো। রিপোর্টে অনুমান করা হয়েছে, সমগ্র ভারত জুড়ে যদি মাত্র ১ দিনের জন্য চরম তাপপ্রবাহ চলে, তবে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৩,৪০০ জনের অতিরিক্ত মৃত্যু হতে পারে। আর এই তাপপ্রবাহের মেয়াদ বেড়ে যদি টানা ৫ দিন হয়, তবে দেশ জুড়ে অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যাটি এক ধাক্কায় প্রায় ৩০,০০০-এ গিয়ে পৌঁছতে পারে। বর্তমান আবহাওয়ার পরিস্থিতির নিরিখে এই পরিসংখ্যান খতিয়ে দেখলে বোঝা যাবে যে, কেন এই মৃত্যুর ঝুঁকি এত দ্রুত আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।

চরম গ্রীষ্মের চাদরে ঢাকা দেশ ও তীব্র প্রভাব

ভারতে তীব্র গরম পড়া নতুন কোনও বিষয় নয়, তবে গত কয়েক বছরে এই তাপপ্রবাহের স্থায়িত্ব এবং তীব্রতা দুটোই বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের উত্তর, মধ্য এবং পশ্চিমের রাজ্যগুলিতে চরম আবহাওয়া গ্রাস করেছে। দিল্লি-এনসিআর, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ এবং রাজস্থানের মতো জায়গাগুলিতে আবহাওয়া দফতরের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই তীব্র তাপপ্রবাহের জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছে। চলতি বছরে আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে ‘উষ্ণ রাত’। কংক্রিটের জঙ্গল ও বহুতল আবাসন সমৃদ্ধ শহরাঞ্চলগুলিতে সূর্যাস্তের পরও চারপাশের পরিবেশ তপ্ত থাকায় মানুষ রাতের বেলাতেও সামান্যতম স্বস্তিটুকু পাচ্ছেন না। এই তীব্র গরমের প্রভাব মাঠে কর্মরত কৃষক, দিনমজুর, রাজমিস্ত্রি বা অন্যান্য আউটডোর কর্মী এবং বয়স্ক মানুষদের ওপর সবথেকে বেশি পড়ছে।

লুকানো বিপদ ও পরিকাঠামোর অভাব

এই সমীক্ষা থেকে প্রাপ্ত সংখ্যাগুলি আরও বেশি উদ্বেগজনক এই কারণে যে, এই ধরণের তাপপ্রবাহে মৃত্যুর প্রকৃত খবর খুব কমই সামনে আসে। গরমে হওয়া সিংহভাগ মৃত্যুকে সরাসরি ‘হিটস্ট্রোক’ বলে চিহ্নিত করা হয় না। তীব্র দাবদাহের কারণে শরীরের ওপর যে ধকল যায়, তার ফলে মূলত হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা তীব্র শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা দেয় এবং আক্রান্তরা মারা যান। আমেরিকার ‘ইউসি বার্কলে’ (UC Berkeley)-র দুই গবেষক পীযূষ নারং এবং অশোক গ্যাডগিল তাঁদের নতুন গবেষণার মাধ্যমে জানিয়েছেন, তাঁদের দেওয়া এই পরিসংখ্যানটি অত্যন্ত সতর্কভাবে তৈরি করা একটি সর্বনিম্ন অনুমান মাত্র, অর্থাৎ বাস্তব ক্ষেত্রে মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে।

এই গবেষণার ফলাফলে সবথেকে উদ্বেগজনক রাজ্য হিসেবে সামনে এসেছে উত্তরপ্রদেশের নাম। সমীক্ষা বলছে, মাত্র ৫ দিনের একটি তীব্র তাপপ্রবাহের জেরে এক উত্তরপ্রদেশেই ৮,০০০-এর বেশি অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এছাড়া আহমেদাবাদ, জয়পুর এবং সুরাটের মতো বড় শহরগুলির অন্তর্গত জেলাগুলিতে মাত্র এক দিনের চরম গরমে ২৫০ জনেরও বেশি অতিরিক্ত প্রাণহানি ঘটতে পারে। সমীক্ষায় আরও দেখা গিয়েছে যে, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া গরিব রাজ্যগুলি নিজেদের সীমিত সম্পদের কারণে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পৃথিবীর তাপমাত্রা যেভাবে দিন দিন বাড়ছে, তাতে আগামী দিনে এই ধরণের তাপপ্রবাহ আরও বৃদ্ধি পাবে বলেই আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *