ডিজিটাল লক করে ফ্ল্যাটে বন্দি আদিবাসী মহিলা, ২ বছর ধরে অমানুষিক অত্যাচারের পর উদ্ধার!

ডিজিটাল লক করে ফ্ল্যাটে বন্দি আদিবাসী মহিলা, ২ বছর ধরে অমানুষিক অত্যাচারের পর উদ্ধার!

গুরুগ্রাম: দিনভর টানা ১৬ ঘণ্টা কাজ করানো, সামান্য কারণে পশুর মতো মারধর আর বাইরের দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রাখা! গুরুগ্রামের সেক্টর ৯১-এর একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে গত দুই বছর ধরে এমনই নারকীয় নির্যাতনের শিকার হলেন পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার এক ৩৯ বছর বয়সী আদিবাসী মহিলা। ফ্ল্যাটের ‘স্মার্ট ডিজিটাল লক’ ব্যবস্থার কারণে বন্দিদশা থেকে পালানোর কোনও পথ ছিল না তাঁর। অবশেষে, বাড়িতে আসা এক সার্ভিস টেকনিশিয়ানের মোবাইল ফোনের সাহায্যে বাড়ির লোকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন তিনি। আর তার পরেই সামনে আসে এই রোমহর্ষক ঘটনা।

পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ, গুরুগ্রাম পুলিশ এবং এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার যৌথ অভিযানে গত শনিবার ওই ফ্ল্যাটে হানা দিয়ে অবশেষে উদ্ধার করা হয় নির্যাতিতাকে।

মারধরের চোটে হারিয়েছেন শ্রবণশক্তি, বিকল হাত:

উদ্ধার পাওয়ার পর পুলিশের কাছে নিজের ওপর হওয়া অত্যাচারের বিবরণ দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ওই মহিলা। তিনি জানান, মালিকের লাগাতার মারধরের কারণে তিনি ডান হাত তুলতে পারেন না এবং তাঁর ডান কানের শ্রবণশক্তিও চলে গেছে। এমনকি উদ্ধারের দিন সকালেও তাঁর মাথা ও মুখে এমনভাবে মারধর করা হয় যে, তিনি ভেবেছিলেন আর বাঁচবেন না।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ওই পরিচারিকাকে কাজে রাখার জন্য বাড়ির মালিক এক দালালকে ৪০ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়ে প্রথমে দিল্লি এবং পরে গুরুগ্রামে নিয়ে আসেন। ঠিক কী পরিস্থিতিতে তাঁকে এখানে আনা হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

ডিজিটাল লক করে চলত নারকীয় নির্যাতন:

বাড়ির মালিকরা বাইরে যাওয়ার সময় ফ্ল্যাটের ডিজিটাল লক বন্ধ করে দিয়ে যেতেন, যাতে ওই মহিলা কোনওভাবেই বেরোতে না পারেন। বাড়ির লোকের সাথেও যোগাযোগ করতে দেওয়া হতো না। চলতি বছরের মার্চ মাসেই নির্যাতিতার বোন বীরভূমের প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। তিনি জানান, বাড়ি ফেরার কথা বললেই দিদির ওপর অত্যাচারের মাত্রা আরও বেড়ে যেত।

সম্প্রতি ওই ফ্ল্যাটে এক মেকানিক বা সার্ভিস টেকনিশিয়ান এলে নির্যাতিতা মহিলা বুদ্ধি খাটিয়ে তাঁর সাহায্য চান। কোনওরকমে তাঁকে বুঝিয়ে, তাঁর মোবাইল ফোন থেকে নিজের পরিবারকে ফোন করে নিজের বন্দিদশার কথা জানান। এর পরেই তাঁর পরিবার দ্রুত পুলিশের দ্বারস্থ হয়।

তদন্তে পুলিশ, টুকরো টুকরো করে কাটার হুমকি:

গত ৪ জুন পশ্চিমবঙ্গের একটি থানায় এই বিষয়ে এফআইআর (FIR) দায়ের করা হয়। দাসপ্রথা বিরোধী আইন (Bonded Labour Act) এবং ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর ১২৭(৪) ধারায় মামলা রুজু করে বীরভূম পুলিশের একটি বিশেষ দল গুরুগ্রামে পৌঁছায় এবং স্থানীয় পুলিশের সাহায্যে ফ্ল্যাটে হানা দিয়ে মহিলাকে উদ্ধার করে। গুরুগ্রাম পুলিশের এএসআই রাজেশ খোওয়াল জানান, অভিযানের সময় অভিযুক্ত মালিক ও তাঁর পরিবার বাড়িতে ছিল না।

প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ওই পরিবারটি মহিলার ওপর চরম নৃশংসতা চালাত। যদি তিনি ব্যালকনি থেকে কাউকে ডেকে সাহায্য চাওয়ার চেষ্টা করতেন, তবে তাঁকে মেরে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলার হুমকি দেওয়া হতো। বর্তমানে ওই মহিলা চরম মানসিক ট্রমার মধ্যে রয়েছেন। অভিযুক্তদের খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছে পুলিশ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *