যুদ্ধবিরতির চুক্তি হলেও কাটছে না মেঘ, আবার কি অশান্ত হবে মধ্যপ্রাচ্য?

যুদ্ধবিরতির চুক্তি হলেও কাটছে না মেঘ, আবার কি অশান্ত হবে মধ্যপ্রাচ্য?

আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর অবশেষে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং হোয়াইট হাউসের শীর্ষ কর্তারা অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে সওয়াল করেছেন। ট্রাম্পের দাবি, এই চুক্তির ফলে বিশ্ববাজারে আবার অবাধে তেল সরবরাহ শুরু হবে। তবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত এই সমঝোতা স্মারক বা মউ (MoU) এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ্যে না আসায় আন্তর্জাতিক মহলে চুক্তি স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং লেবানন সংকটের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর অস্পষ্টতা নতুন করে যুদ্ধ বাঁধার আশঙ্কা তৈরি করছে।

হরমুজ প্রণালী নিয়ে ধোঁয়াশা ও তেলের বাজার

বিশ্বের মোট তেল পরিবহণের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সম্পন্ন হয় গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ উন্মুক্ত এবং মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ প্রত্যাহারের নির্দেশ দিলেও এই সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। চুক্তির মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ তাঁর প্রাথমিক বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালীর কথা উল্লেখ করেননি। অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘মেহর’-এর দাবি, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ‘ইরানের তত্ত্বাবধানে’ এই প্রণালী পুনরায় চালু হবে।

আমেরিকা এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলো (ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালি) স্পষ্ট জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ কোনো একক পক্ষের হাতে থাকবে না এবং আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বাধীনতা সম্পূর্ণ নিঃশর্ত হতে হবে। এই যুদ্ধবিরতির খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত কমলেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিকাঠামো মেরামত করে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি উৎপাদন স্বাভাবিক হতে বহু সময় লাগবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক শিপিং ও বিমা সংস্থাগুলো এই জলপথকে কতটা নিরাপদ মনে করবে, তার ওপরই বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নির্ভর করছে।

লেবানন ইস্যু ও ইজরায়েলের অনীহা

চুক্তির অন্যতম বড় শর্ত হলো লেবাননসহ সমস্ত যুদ্ধক্ষেত্রে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি। কিন্তু এই শান্তি আলোচনায় ইজরায়েলকে অন্তর্ভুক্ত না করায় তারা ক্ষুব্ধ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু নিজের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থে ইরান ও তার সহযোগী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সংঘাত জারি রাখতে চান। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইজরায়েল ইতিমধ্যেই বৈরুতে হামলা চালিয়েছে, যার কারণে এই চুক্তি প্রক্রিয়া কয়েক ঘণ্টা পিছিয়েও গিয়েছিল। নেতানিয়াহুর এই অনমনীয় মনোভাব এবং নতুন কোনো সামরিক পদক্ষেপ এই মার্কিন-ইরান সমঝোতাকে যেকোনো মুহূর্তে ভেস্তে দিতে পারে।

পরমাণু প্রকল্পের ভবিষ্যৎ ও ফের হামলার হুঁশিয়ারি

ইরানের পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি এই যুদ্ধের মূল অনুঘটক। ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরান পরমাণু চুক্তি না মানলে তেহরানে আবারও মার্কিন হামলা শুরু হবে। ইউরোপীয় জোটও জানিয়েছে, ইরান পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ করলে তবেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে। বিপরীতে, ইরান তাদের কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ দাবি করলেও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ত্যাগ করার বিষয়ে এখনও কোনো স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ফলে পরমাণু চুক্তির এই অস্পষ্টতা ও ইজরায়েলের সম্ভাব্য আগ্রাসন মধ্যপ্রাচ্যকে আবারও এক অনিশ্চিত যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *