রাজভবন থেকে হাইকোর্ট, উত্তপ্ত বঙ্গ রাজনীতিতে বড়সড় বদলের হাওয়া!

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিমণ্ডলে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের আবহ তৈরি হয়েছে। রাজ্য বিধানসভার বাজেট অধিবেশন শুরুর দিনেই রাজ্যপাল আর এন রবির ভাষণকে কেন্দ্র করে বিদায়ী ও বর্তমান ব্যবস্থার মধ্যকার সংঘাত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে রাজভবন থেকে পূর্বতন তৃণমূল সরকারের দুর্নীতি ও তোলাবাজির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শাণানো হয়েছে, অন্যদিকে কলকাতা হাইকোর্টের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রায় ও কেন্দ্রীয় সংস্থার তৎপরতা রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণকে এক নতুন মাত্রায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
রাজ্যপালের ভাষণে অতীত সরকারের সমালোচনা ও নতুন নীতি
বাজেট অধিবেশনের সূচনা পর্বে রাজ্যপালের বক্তব্য ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ভাষণে পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলের বালিপাচার ও তোলাবাজির মতো গুরুতর অভিযোগগুলো সরাসরি তুলে ধরা হয়েছে। এর বিপরীতে বর্তমান সরকারের গৃহীত বিভিন্ন জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপ, যেমন মহিলাদের জন্য ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ এবং বিনামূল্যে বাসে যাতায়াতের সুবিধার কথা উল্লেখ করা হয়। এছাড়া, শিক্ষা ক্ষেত্রে ‘থ্রেট কালচার’ বন্ধ করা, নারী নির্যাতনে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ এবং পূর্ববর্তী সরকারের আমলের নিয়োগ দুর্নীতি এড়াতে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ শূন্যপদ তালিকা তৈরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলোর কার্যকর রূপায়ণ এবং উত্তরবঙ্গের চা বাগান ও পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে সরকারের এই ইতিবাচক অবস্থান রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামোতে একটি বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আইনি দ্বন্দ্বে সিলমোহর এবং দুর্নীতির সাঁড়াশি অভিযান
আইনি ফ্রন্টেও রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। বিধানসভার বিরোধী দলনেতা নির্বাচন নিয়ে চলা দীর্ঘ টানাপোড়েনের অবসান ঘটিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট। বিচারপতি কৃষ্ণা রাওয়ের একক বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, রথীন্দ্রনাথ বসুর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ই রাজ্যের বিরোধী দলনেতা হিসেবে বহাল থাকছেন, যা তৃণমূলের একাংশের দাবিকে খারিজ করে দেয়। এই আইনি ধাক্কার পাশাপাশি রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে তৃণমূলের হেভিওয়েট নেতা উদয়ন গুহ ও সুশান্ত ঘোষের সাম্প্রতিক গ্রেফতারি।
একই সাথে, জমি দখল দুর্নীতি মামলায় ব্যবসায়ী জয় কামদারের বিরুদ্ধে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) ৭৭ পাতার চাঞ্চল্যকর চার্জশিট পেশ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রভাবশালীদের যোগসাজশে প্রবীণ নাগরিকদের জমি-বাড়ি দখলের এই ঘটনাটি প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা দুর্নীতির গভীরতাকে সামনে এনেছে।
অন্য একটি জনস্বার্থ মামলায়, আন্তর্জাতিক যোগ দিবস উপলক্ষে রেড রোড দীর্ঘ সাত দিন বন্ধ থাকা নিয়ে আমজনতার ভোগান্তির বিষয়ে হাইকোর্ট উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আদালত নাগরিকদের বিকল্প পথ ব্যবহারের পরামর্শ দিলেও, কেন এই অনুষ্ঠান ব্রিগেডের মতো বড় মাঠে করা হলো না, সেই প্রশ্ন তুলে প্রশাসনিক দূরদর্শিতার অভাবকেই চিহ্নিত করেছে। সামগ্রিকভাবে, রাজনৈতিক ক্ষমতার এই রদবদল, আইনি সক্রিয়তা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের শাসনব্যবস্থা ও জনমানসে এক দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে চলেছে।